আইইএলটিএস পরীক্ষার নিয়ম: ফরম্যাট, ব্যান্ড স্কোর ও প্রস্তুতির গাইড

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ · বিদেশে উচ্চশিক্ষা

সংক্ষেপেআইইএলটিএস হলো ইংরেজি দক্ষতার আন্তর্জাতিক পরীক্ষা। এখানে পরীক্ষার ধরন, চার অংশের সময়সীমা, স্কোরের হিসাব আর প্রস্তুতির ধাপগুলো এক জায়গায় পাবেন।

বিদেশে পড়াশোনা, স্কলারশিপ কিংবা অভিবাসনের কথা উঠলেই প্রথম যে নামটি সামনে আসে, সেটি আইইএলটিএস (IELTS)। পুরো নাম International English Language Testing System। এই পরীক্ষায় আপনি ইংরেজি শুনে বুঝতে, পড়তে, লিখতে ও বলতে কতটা দক্ষ, তা যাচাই করা হয়। পরীক্ষা দিতে নির্দিষ্ট বয়সসীমা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত নেই, তবে বিশ্ববিদ্যালয় বা দূতাবাস কত স্কোর চায়, সেটা আগে জেনে নেওয়া জরুরি।

কাদের আইইএলটিএস দরকার হয়

মূলত তিন ধরনের মানুষ এই পরীক্ষা দেন। যাঁরা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা পিএইচডিতে আবেদন করবেন, যাঁরা কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে কাজ বা স্থায়ী বসবাসের আবেদন করবেন, আর যাঁরা নিজের ইংরেজি দক্ষতার একটি আন্তর্জাতিক সনদ হাতে রাখতে চান। সনদটি সাধারণত পরীক্ষার তারিখ থেকে দুই বছর পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। স্কলারশিপের আবেদন নিয়ে ভাবলে বিদেশে স্কলারশিপ গাইড লেখাটিও দেখে নিতে পারেন, কারণ সেখানে স্কোরের শর্ত আবেদনের একটি বড় অংশ।

অ্যাকাডেমিক ও জেনারেল ট্রেনিংয়ের পার্থক্য

পরীক্ষার দুটি সংস্করণ আছে। লিসেনিং ও স্পিকিং দুটোতেই এক, পার্থক্য রিডিং ও রাইটিংয়ে।

বিষয়অ্যাকাডেমিকজেনারেল ট্রেনিং
কার জন্যউচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকাজ, প্রশিক্ষণ ও অভিবাসন
রিডিংয়ের ধরনজার্নাল, বই ও গবেষণাধর্মী লেখাবিজ্ঞাপন, নোটিশ ও দৈনন্দিন জীবনের লেখা
রাইটিং টাস্ক ১গ্রাফ, চার্ট বা প্রক্রিয়ার বর্ণনাচিঠি লেখা
রাইটিং টাস্ক ২একটি বিষয়ে যুক্তিনির্ভর রচনা (দুটোতেই প্রায় একই)

পরীক্ষার চার অংশ: সময় ও প্রশ্ন

অংশসময়কী থাকে
লিসেনিংপ্রায় ৩০ মিনিটচারটি অডিও, মোট ৪০টি প্রশ্ন
রিডিং৬০ মিনিটতিনটি অনুচ্ছেদ, মোট ৪০টি প্রশ্ন
রাইটিং৬০ মিনিটদুটি টাস্ক (টাস্ক ১-এ কমপক্ষে ১৫০ ও টাস্ক ২-এ কমপক্ষে ২৫০ শব্দ)
স্পিকিং১১ থেকে ১৪ মিনিটপরীক্ষকের সঙ্গে মুখোমুখি তিন ধাপের কথোপকথন

লিসেনিং, রিডিং ও রাইটিং একই দিনে পরপর হয়, মোট সময় প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। স্পিকিং একই দিনে অথবা আগে-পরে অন্য সময়ে হতে পারে। কোন তারিখে কোনটি পড়বে, তা নিবন্ধনের সময় জানিয়ে দেওয়া হয়।

লিসেনিং

অডিও একবারই বাজানো হয়, তাই মনোযোগ ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এতে ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান, আমেরিকান ও কানাডিয়ান সহ নানা উচ্চারণ শোনা যায়। চারটি সেকশন ক্রমে কঠিন হয়। প্রথমটিতে দৈনন্দিন বিষয়ে দুজনের কথোপকথন, দ্বিতীয়টিতে সাধারণ প্রসঙ্গে একজনের বক্তব্য, তৃতীয়টিতে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নিয়ে একাধিক জনের আলোচনা, আর চতুর্থটিতে একাডেমিক বিষয়ে একজনের লেকচার।

প্রশ্নের ধরন হতে পারে শূন্যস্থান পূরণ, বহুনির্বাচনী, মিলিয়ে লেখা কিংবা মানচিত্র বা নকশা দেখে উত্তর দেওয়া। কয়েকটি কৌশল কাজে দেয়:

কাগজে পরীক্ষায় অডিও শেষে উত্তর উত্তরপত্রে তোলার জন্য আলাদা অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়।

রিডিং

এখানে লম্বা লেখা দ্রুত পড়ে নির্দিষ্ট তথ্য বের করতে হয়। সময় কম, তাই প্রতিটি শব্দ পড়ার বদলে স্কিমিং ও স্ক্যানিংয়ের অভ্যাস গড়া দরকার। অর্থাৎ আগে শিরোনাম ও প্রতি অনুচ্ছেদের প্রথম বাক্য দেখে মূল ভাবনা ধরুন, তারপর প্রশ্নের সূত্রশব্দ ধরে লেখায় খুঁজুন।

প্রধান প্রশ্নের ধরনগুলো হলো:

রিডিংয়ে উত্তর তোলার আলাদা সময় নেই। তাই কোনো প্রশ্নে আটকে গেলে চিহ্ন দিয়ে এগিয়ে যান এবং শেষে ফিরে আসুন। তিনটি অনুচ্ছেদে প্রায় ২০ মিনিট করে ভাগ করে রাখা একটি সাধারণ নিয়ম।

রাইটিং

টাস্ক ২-এর নম্বর বেশি, তাই সময়ের বড় অংশ সেখানে দিন। সাধারণ হিসাবে টাস্ক ১-এ প্রায় ২০ মিনিট ও টাস্ক ২-এ প্রায় ৪০ মিনিট রাখা যায়। দুই টাস্কের পার্থক্য এমন:

দুই টাস্কেই চারটি বিষয়ে মূল্যায়ন হয়। প্রশ্নের চাহিদা পূরণ, ভাবের ধারাবাহিকতা ও অনুচ্ছেদ সাজানো, শব্দভান্ডার, আর ব্যাকরণের বৈচিত্র্য ও নির্ভুলতা। সাধারণভাবে নিচের ব্যান্ডে লেখা প্রশ্নের অংশবিশেষ ছুঁয়ে যায়, সীমিত শব্দ ও প্রচুর ব্যাকরণ ভুল থাকে। মাঝামাঝি ব্যান্ডে মূল বক্তব্য বোঝা যায়, কিন্তু যুক্তি অসম্পূর্ণ বা পুনরাবৃত্ত হয়। উঁচু ব্যান্ডে সব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর, সুসংহত গঠন, প্রাসঙ্গিক শব্দচয়ন এবং খুব কম ভুল দেখা যায়। ন্যূনতম শব্দসংখ্যার কম লিখলে নম্বর কাটা পড়তে পারে।

স্পিকিং

উচ্চারণ, শব্দভান্ডার, ব্যাকরণ ও সাবলীলতা, এই চার বিষয়ে নম্বর হয়। অনুষ্ঠানটি রেকর্ড করা হয় এবং তিন ধাপে চলে।

মুখস্থ করা উত্তর বলার চেষ্টা করলে পরীক্ষক সহজেই ধরে ফেলেন। স্বাভাবিকভাবে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলুন, প্রশ্ন না বুঝলে ভদ্রভাবে আবার বলতে অনুরোধ করুন।

ব্যান্ড স্কোর কীভাবে নির্ধারিত হয়

প্রতিটি অংশের জন্য ০ থেকে ৯ স্কেলে আলাদা ব্যান্ড দেওয়া হয়। চারটির গড় থেকে মোট (ওভারঅল) ব্যান্ড বের হয়, যা সাধারণত অর্ধেক ব্যান্ড পর্যন্ত রাউন্ড করা হয়। আইইএলটিএসে আলাদা করে "পাস" বা "ফেল" নেই। কত ব্যান্ড লাগবে, সেটা ঠিক করে আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্স বা দেশে আবেদন করছেন তারা। তাই আবেদনের আগে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ন্যূনতম স্কোর দেখে নিন। অনেক প্রতিষ্ঠান ওভারঅলের পাশাপাশি প্রতি অংশেও ন্যূনতম ব্যান্ড চায়, যেমন রাইটিংয়ে অন্তত একটি নির্দিষ্ট স্কোর।

লিসেনিং ও রিডিংয়ে ভুল উত্তরের জন্য নম্বর কাটা হয় না। তাই কোনো প্রশ্ন ফাঁকা না রেখে অন্তত একটি অনুমানের উত্তর দিন।

কম্পিউটার-ভিত্তিক ও পেপার-ভিত্তিক পরীক্ষা

বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপি, এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরীক্ষা দেওয়া যায়। দুই পদ্ধতির পার্থক্য হলো:

দুই পদ্ধতিতেই স্পিকিং পরীক্ষা জীবন্ত পরীক্ষকের সামনে হয়। ফি, সময়সূচি, কেন্দ্র ও ফলাফলের সঠিক দিন সময়ে সময়ে বদলায়, তাই নিবন্ধনের আগে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখে নিন।

প্রস্তুতির কার্যকর কৌশল

  1. পরীক্ষার কাঠামো বুঝুন। কোন অংশে কত সময়, কেমন প্রশ্ন, তা না জেনে পড়াশোনা শুরু করলে সময় নষ্ট হয়।
  2. প্রথমে একটি মক টেস্ট দিন। এতে নিজের বর্তমান ব্যান্ড ও দুর্বল অংশ পরিষ্কার হবে।
  3. শোনার অভ্যাস করুন। পডকাস্ট, ডকুমেন্টারি ও সংবাদ ইংরেজিতে শুনুন, ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণসহ।
  4. প্রতিদিন কিছু পড়ুন। ইংরেজি সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিনের একটি লেখা পড়ে অচেনা শব্দগুলো খাতায় টুকে রাখুন।
  5. সপ্তাহে অন্তত দুটি রচনা লিখুন। সম্ভব হলে কাউকে দিয়ে বা অনলাইন টুল দিয়ে ভুল ধরিয়ে নিন।
  6. কথা বলুন। বন্ধুর সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলুন, অথবা নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করে শুনে উচ্চারণের ভুল খুঁজুন।
  7. দুর্বল অংশে বেশি সময় দিন এবং সময় ধরে অনুশীলন করুন। সময়ের চাপ সামলানো এই পরীক্ষার বড় অংশ।

চার সপ্তাহের নমুনা পরিকল্পনা

আপনার ইংরেজির ভিত্তি মোটামুটি ভালো থাকলে এই ছকটি শুরুর কাঠামো হিসেবে নিতে পারেন। দৈনিক দুই-তিন ঘণ্টা সময় ধরা হয়েছে, নিজের সুবিধামতো বদলে নিন।

সপ্তাহমূল লক্ষ্যকী করবেন
১পরিচিতি ও মূল্যায়নএকটি পূর্ণ মক টেস্ট দিন, প্রশ্নের ধরন চিনুন, দুর্বল অংশের তালিকা করুন, দৈনিক শব্দ খাতা শুরু করুন
২লিসেনিং ও রিডিংপ্রতিদিন একটি লিসেনিং সেকশন ও একটি রিডিং অনুচ্ছেদ সময় ধরে সমাধান করুন, ভুলের কারণ লিখে রাখুন
৩রাইটিং ও স্পিকিংসপ্তাহে দুটি টাস্ক ২ ও দুটি টাস্ক ১ লিখুন, প্রতিদিন তিনটি ধাপের প্রশ্নে কথা রেকর্ড করুন
৪সময়ের চাপে অনুশীলনদুটি পূর্ণ মক টেস্ট, ভুল বিশ্লেষণ, উত্তর পাতায় তোলার অনুশীলন, শেষ দুই দিন হালকা পুনরাবৃত্তি

আপনার বর্তমান ব্যান্ড লক্ষ্যের অনেক নিচে হলে চার সপ্তাহ যথেষ্ট নাও হতে পারে। তখন একই ছক কয়েকবার ঘুরিয়ে প্রয়োগ করুন এবং ভাষার ভিত্তি মজবুত করতে বেশি সময় দিন। চার সপ্তাহে নির্দিষ্ট ব্যান্ড পাওয়ার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

পরীক্ষার্থীদের সাধারণ ভুল

পরীক্ষার দিনের কিছু পরামর্শ

আগের রাতে একটি তালিকা মিলিয়ে নিন:

শেষ কথা

আইইএলটিএসে ভালো করতে জাদুকরী কোনো পথ নেই। নিয়মিত অনুশীলন, নিজের দুর্বলতা চিনে সেগুলো ঠিক করা আর পরীক্ষার কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হওয়া, এই তিনটি জিনিসই সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়। লক্ষ্য ঠিক করে প্রতিদিন অল্প অল্প করে এগোলে কয়েক মাসেই পরিবর্তন চোখে পড়বে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

আইইএলটিএস পরীক্ষায় মোট কত সময় লাগে?

লিসেনিং, রিডিং ও রাইটিং একই দিনে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে শেষ হয়। স্পিকিং ১১ থেকে ১৪ মিনিটের এবং তা একই দিনে বা আলাদা দিনে হতে পারে।

ভুল উত্তরের জন্য কি নম্বর কাটা যায়?

না, ভুল উত্তরের জন্য আলাদা করে নম্বর কাটা হয় না। তাই কোনো প্রশ্ন ফাঁকা না রাখাই ভালো।

আইইএলটিএসে পাস মার্ক কত?

নির্দিষ্ট কোনো পাস মার্ক নেই। ০ থেকে ৯ ব্যান্ডে স্কোর দেওয়া হয় এবং কত ব্যান্ড লাগবে তা নির্ভর করে আবেদনকৃত প্রতিষ্ঠান বা দেশের ওপর।

অ্যাকাডেমিক আর জেনারেল ট্রেনিংয়ের মধ্যে কোনটি দেব?

উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য অ্যাকাডেমিক, আর কাজ, প্রশিক্ষণ বা অভিবাসনের জন্য সাধারণত জেনারেল ট্রেনিং লাগে। আবেদনের আগে প্রতিষ্ঠানের শর্ত দেখে নিন।

ফলাফল কত দিনে পাওয়া যায়?

কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষার ফলাফল সাধারণত তিন থেকে পাঁচ দিনে এবং পেপার-ভিত্তিকের ফলাফল প্রায় ১৩ দিনে পাওয়া যায়। সঠিক দিন ব্রিটিশ কাউন্সিল বা আইডিপির ওয়েবসাইটে দেখে নিন।