জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের মূলভাব ও আলোচনা
এইচএসসি বাংলা পাঠ্যসূচির যে প্রবন্ধগুলো ভাবনার খোরাক জোগায়, তার একটি মোতাহের হোসেন চৌধুরীর "জীবন ও বৃক্ষ"। জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের মূলভাব বুঝতে পারলে পুরো রচনাটাই আপনার কাছে সহজ হয়ে যায়, কারণ লেখক এখানে একটি মাত্র তুলনাকে ঘুরিয়েফিরিয়ে নানা দিক থেকে দেখিয়েছেন। এই লেখায় আমরা লেখকের পরিচয়, প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় বক্তব্য, গাছ ও মানুষের তুলনা, রচনার ধরন এবং পরীক্ষার জন্য কয়েকটি মৌলিক অনুশীলন প্রশ্ন দেখব।
লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
মোতাহের হোসেন চৌধুরী ১৯০৩ সালে নোয়াখালী জেলার কাঞ্চনপুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৫৬ সালে মারা যান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে ঢাকায়। বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ ঘিরে যে "বুদ্ধির মুক্তি" আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এই আন্দোলনের মূল কথা ছিল সংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বদলে যুক্তি, প্রশ্ন করার সাহস আর মুক্ত চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
তাঁর লেখায় সেই মুক্তচিন্তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি সৌন্দর্যবোধ, মানবিকতা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে বারবার ফিরে গেছেন। তাঁর পরিচিত প্রবন্ধগ্রন্থ সংস্কৃতি কথা, আর জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধটি সাধারণভাবে সেই গ্রন্থের রচনা হিসেবেই পরিচিত। আপনার পাঠ্যবইয়ে গ্রন্থের নাম বা প্রকাশের সাল কীভাবে দেওয়া আছে, উত্তরে সেটাই মিলিয়ে লিখবেন।
প্রবন্ধের মূলভাব
প্রবন্ধের কেন্দ্রে আছে একটি প্রশ্ন: মানুষ কেমন করে বাঁচলে তার জীবন সার্থক হয়? লেখকের উত্তর হলো, জীবনকে হতে হবে গাছের মতো। গাছ মাটিতে শিকড় ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, রস টানে, বড় হয়, তারপর ফুল ও ফলে নিজেকে মেলে ধরে। এই বিকাশের পেছনে কোনো হইচই নেই, আছে নীরব ও ধৈর্যশীল সাধনা। আর সেই ফুল-ফল গাছ নিজের জন্য রাখে না, অন্যের কাজেই লাগে।
লেখকের বিশ্বাস, মানুষের জীবনও এমন নিঃস্বার্থ বিকাশের পথেই পূর্ণতা পায়। শুধু শরীর বড় হলেই মানুষ বড় হয় না। অভিজ্ঞতা, দুঃখ-কষ্ট, ভালোবাসা আর গভীর অনুভূতির ভেতর দিয়ে মানুষের ভেতরের সত্তা, অর্থাৎ আত্মা, আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে। প্রবন্ধের ভাবনায় এই আত্মাই মানুষের জীবনবৃক্ষের আসল ফল। তাই কেবল নিজের সুখ, লাভ আর অহংকার নিয়ে ব্যস্ত থাকা জীবনকে ছোট করে ফেলে।
জীবন ও গাছের তুলনা: প্রধান যুক্তিগুলো
প্রবন্ধটি পড়ার সময় তুলনার প্রতিটি ধাপ আলাদা করে চিনে রাখলে উত্তর লেখা সহজ হয়। নিচের তালিকায় মূল ধারণাগুলো সাজানো হলো।
| গাছের দিক | মানুষের জীবনে এর ইঙ্গিত |
|---|---|
| শিকড় দিয়ে মাটি থেকে রস নেওয়া | পরিবেশ, সমাজ ও অভিজ্ঞতা থেকে জীবনের খোরাক সংগ্রহ |
| ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা | তাড়াহুড়ো নয়, ধৈর্য ও নিরবচ্ছিন্ন চর্চায় গড়ে ওঠা ব্যক্তিত্ব |
| নীরবে কাজ করা | প্রচারের আশা ছাড়া নিজের সাধনায় মগ্ন থাকা |
| ফুল ও ফল দেওয়া | সৌন্দর্য, মানবিকতা ও সেবার মধ্য দিয়ে অন্যের কল্যাণ |
| ফলের মধ্যে সার্থকতা | অন্তরের সত্তা বা আত্মার পরিণতিই জীবনের আসল প্রাপ্তি |
লেখক এখানে একটি পুরনো কবিসুলভ ভাবনার সঙ্গেও নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে দেখেছেন। অনেকের কাছে জীবন নদীর স্রোতের মতো, যা বয়ে চলে আর সব ছুঁয়ে যায়। কিন্তু লেখক গাছের উপমাকে বেশি অর্থবহ মনে করেন। কারণ গাছের পরিশ্রমের ফল চোখে দেখা যায়, আর তার বেড়ে ওঠার মধ্যে একটা স্থিরতা ও শান্ত ভাব আছে। নদী চলে যায়, গাছ থেকে যায় এবং দেয়।
প্রবন্ধে নেতিবাচক দিকও আছে। যারা হিংসা, স্বার্থপরতা ও অহংকারে ডুবে থাকে, তারা শুধু নিজের ক্ষতি করে না, অন্যের এগিয়ে যাওয়ার পথেও বাধা তৈরি করে। গাছ এর বিপরীত দৃষ্টান্ত, কারণ সে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েও ক্ষয়ে যায় না, বরং আরও পূর্ণ হয়।
এই তুলনার আরেকটি দিক হলো সময়। গাছ একদিনে ফল দেয় না। বীজ থেকে চারা, চারা থেকে ডালপালা, তারপর কুঁড়ি আর শেষে ফল, প্রতিটি ধাপের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। লেখক যেন বলতে চান, মানুষের জীবনেও আত্মার বিকাশ হঠাৎ ঘটে না। ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা ও উপলব্ধি জমতে জমতেই একদিন ভেতরের মানুষটি পরিণত হয়। তাই যাঁরা দ্রুত সাফল্য আর বাহ্যিক জৌলুসের পেছনে ছোটেন, প্রবন্ধটি তাঁদের থেমে ভাবতে বলে।
আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। গাছ প্রতিবেশী গাছের সঙ্গে হিংসা করে না, কারও আলো কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করে না, নিজের মতো করে বেড়ে ওঠে। মানুষের সমাজে ঠিক এই গুণটাই সবচেয়ে বিরল। তাই লেখক গাছকে শুধু প্রকৃতির উদাহরণ হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন নৈতিক আদর্শ হিসেবে।
ভাষা ও রচনারীতি
এটি একটি চিন্তাপ্রধান প্রবন্ধ, তবু পড়তে ভারী লাগে না। লেখক বড় বড় তত্ত্ব আউড়ে পাঠককে ভয় দেখান না। তিনি পরিচিত একটি দৃশ্যকে, অর্থাৎ গাছের বেড়ে ওঠাকে, ধাপে ধাপে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখান। ফলে কঠিন ভাবনাও পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।
রচনার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আপনি সহজেই খেয়াল করতে পারবেন:
- উপমা-নির্ভর বিন্যাস। পুরো প্রবন্ধ দাঁড়িয়ে আছে একটি রূপকের ওপর, যার ভেতরে নানা ছোট তুলনা জায়গা পেয়েছে।
- যুক্তির ধারাবাহিকতা। বক্তব্য একটার পর একটা সাজানো, তাই পাঠক সহজে অনুসরণ করতে পারেন।
- সংযত ও মার্জিত ভাষা। আবেগ আছে, কিন্তু উচ্ছ্বাসের বাড়াবাড়ি নেই।
- মানবিক সুর। সেবা, সৌন্দর্য ও ভালোবাসার ওপর জোর দেওয়ায় লেখাটি উপদেশ না হয়ে আন্তরিক আহ্বানের মতো শোনায়।
এইচএসসিতে কেন প্রবন্ধটি পড়ানো হয়
প্রথমত, এটি শিক্ষার্থীকে প্রবন্ধ পড়ার একটি আদর্শ নমুনা দেয়, যেখানে একটি কেন্দ্রীয় ভাবনা সুশৃঙ্খলভাবে বিকশিত হয়। দ্বিতীয়ত, প্রবন্ধটি মূল্যবোধের কথা বলে। স্বার্থপরতার বদলে সেবা, প্রতিযোগিতার বদলে বিকাশ, এই বার্তা কিশোর-তরুণ বয়সে ভাবার মতো বিষয়। তৃতীয়ত, রূপক ও উপমা বিশ্লেষণের অভ্যাস তৈরি করতে এটি বেশ কাজের। পরীক্ষায় তাই সাধারণত মূলভাব, গাছের সঙ্গে জীবনের তুলনা এবং লেখকের জীবনদর্শন নিয়ে প্রশ্ন আসে।
উত্তর লেখার সময় একটা কৌশল মাথায় রাখুন: প্রথমে এক বা দুই বাক্যে মূল বক্তব্য বলুন, তারপর গাছের বৈশিষ্ট্য ধরে ধরে মানুষের জীবনে তার অর্থ ব্যাখ্যা করুন, শেষে নিজের মূল্যায়ন যোগ করুন। এতে উত্তর গোছানো দেখায়।
পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি সাধারণ ভুলের কথাও বলা দরকার। অনেকে প্রবন্ধটিকে কেবল প্রকৃতিবর্ণনা মনে করে লিখে ফেলেন। আসলে এটি রূপকের মাধ্যমে জীবনদর্শন তুলে ধরা রচনা। তাই উত্তরে গাছের বর্ণনা যতটা দেবেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন সেই বর্ণনার প্রতীকী অর্থের ওপর। একইভাবে নদী ও গাছের তুলনার অংশটি লিখতে গেলে কোনো একটিকে ছোট না করে বরং লেখকের পছন্দের কারণটা বুঝিয়ে বলুন।
অনুশীলন প্রশ্ন ও সংক্ষিপ্ত উত্তর
নিচের প্রশ্নগুলো প্রবন্ধের ভাবনা বুঝে নেওয়ার জন্য তৈরি। উত্তরগুলো নিজের মতো করে লেখা, তাই পরীক্ষায় লেখার সময় পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন।
জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক
- প্রবন্ধটির লেখক কে?
মোতাহের হোসেন চৌধুরী। - লেখক গাছের নীরব কাজকে কীসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
তিনি একে সাধনার মতো দেখেছেন, যেখানে কোনো প্রচার বা প্রদর্শনী নেই, আছে শুধু ধৈর্য ও নিরন্তর বিকাশ। - "শুধু শরীর বাড়লেই মানুষ বড় হয় না" বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এখানে বোঝানো হয়েছে, দেহের বৃদ্ধির পাশাপাশি মনের ও আত্মার বিকাশ না ঘটলে মানুষ পূর্ণ হয় না। অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও ভালোবাসাই ভেতরের মানুষটিকে গড়ে তোলে। - লেখক নদীর চেয়ে গাছের উপমাকে কেন বেছে নিয়েছেন?
কারণ গাছের পরিশ্রমের ফল দেখা যায়, আর তার বেড়ে ওঠায় স্থিরতা ও শান্তির ভাব আছে। এটি মানুষের কাছে একটি অনুসরণযোগ্য আদর্শ হয়ে ওঠে।
উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্ন
- জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধে লেখকের জীবনদর্শন আলোচনা করুন।
লেখকের মতে জীবনের সার্থকতা স্বার্থসিদ্ধিতে নয়, নিঃস্বার্থ বিকাশ ও সেবায়। গাছ যেমন নিজের ফুল-ফল অন্যকে দেয়, মানুষও তেমনি নিজের অন্তরের সম্পদ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করবে। হিংসা, অহংকার ও স্বার্থপরতা সেই বিকাশের বাধা, আর ভালোবাসা ও মানবিকতা তার সহায়ক। - আজকের সমাজে প্রবন্ধটির প্রাসঙ্গিকতা কতটা?
প্রতিযোগিতা ও দ্রুত সাফল্যের এই সময়ে ধৈর্য, নীরব সাধনা আর অন্যের জন্য কিছু করার ভাবনা আরও দরকারি হয়ে উঠেছে। তাই প্রবন্ধের বার্তা এখনো প্রাসঙ্গিক।
শেষ কথা
জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধ আমাদের শেখায়, বড় হওয়া মানে কেবল উঁচু হওয়া নয়, অন্যকে কিছু দিতে পারাও। গাছের উপমার মধ্য দিয়ে লেখক সাধনা, ধৈর্য, আত্মার বিকাশ ও সেবার কথা এমনভাবে বলেছেন যে তা সহজে মনে গেঁথে যায়। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় মূলভাব, তুলনার ধাপগুলো এবং লেখকের পরিচয় গুছিয়ে রাখুন, আর পাঠ্যবইয়ের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের লেখক কে?
প্রবন্ধটির লেখক মোতাহের হোসেন চৌধুরী। তিনি ১৯০৩ সালে নোয়াখালীর কাঞ্চনপুরে জন্মেছিলেন এবং ১৯৫৬ সালে মারা যান।
জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের মূলভাব কী?
মূলভাব হলো, গাছ যেমন নীরবে বেড়ে উঠে ফুল-ফলে অন্যকে দেয়, মানুষেরও তেমনি অন্তরের বিকাশ ঘটিয়ে নিঃস্বার্থ সেবা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে জীবনকে সার্থক করা উচিত।
প্রবন্ধে গাছের সঙ্গে মানুষের জীবনের কী কী মিল দেখানো হয়েছে?
শিকড় দিয়ে রস নেওয়া, ধীরে বেড়ে ওঠা, নীরব সাধনা এবং ফুল-ফলের মাধ্যমে অন্যকে দেওয়া, এসবের সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ, ধৈর্য, সাধনা ও সেবাকে মেলানো হয়েছে।
প্রবন্ধে মানুষের জীবনবৃক্ষের ফল বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এখানে ফল বলতে মানুষের অন্তরের সত্তা বা আত্মার বিকাশকে বোঝানো হয়েছে, যা অভিজ্ঞতা, কষ্ট ও ভালোবাসার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে।
মোতাহের হোসেন চৌধুরী কোন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
তিনি ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজকে ঘিরে গড়ে ওঠা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই আন্দোলন যুক্তি ও মুক্তচিন্তার ওপর জোর দিত।