আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প: বিষয়, ভাষা ও মূল্যায়ন

প্রকাশ: ২ অক্টোবর ২০২৬ · বাংলা সাহিত্য

সংক্ষেপেআখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্পের গ্রন্থতালিকা, শ্রেণিসংগ্রাম ও রাজনীতির প্রতিফলন, গদ্যের বিশেষত্ব এবং পরীক্ষার জন্য গল্প পড়ার কৌশল এখানে সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের আলোচনায় এমন কিছু নাম আসে, যাঁদের লেখা সংখ্যায় কম হলেও প্রভাবে অনেক গভীর। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁদেরই একজন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প পড়তে বসলে প্রথমেই টের পাবেন, এ গল্প আরামে পড়ে ফেলার মতো নয়; প্রতিটি বাক্যে সমাজের ভেতরের টানাপোড়েন চেপে আছে। এই লেখায় তাঁর জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, গল্পগ্রন্থ, প্রধান বিষয়, গদ্যরীতি এবং পরীক্ষার্থী হিসেবে গল্পগুলো কীভাবে পড়বেন, তা ধাপে ধাপে দেখব।

লেখকের পরিচয় ও বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর স্থান

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৪৩ সালে বগুড়া অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৭ সালে ঢাকায় মারা যান। তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষকতাও করেছেন। জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে ঢাকায়, আর শৈশবের উত্তরবঙ্গের গ্রাম ও মফস্বলের স্মৃতি তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। এই দুই ভূখণ্ড, অর্থাৎ নগর ও গ্রাম, তাঁর কথাসাহিত্যের দুটি স্থায়ী ঠিকানা।

তিনি দুটি উপন্যাসের জন্য বিশেষ পরিচিত: চিলেকোঠার সেপাই ও খোয়াবনামা। তবে ছোটগল্পেও তিনি সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মোট লেখার পরিমাণ খুব বেশি নয়। কারণ তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে, বহুবার কেটেকুটে লিখতেন বলে পরিচিত। ফলে প্রতিটি গল্পে তথ্যের ঘনত্ব, চরিত্রের জটিলতা আর ভাষার কারুকাজ চোখে পড়ে। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে বাস্তববাদী ধারার সবচেয়ে শক্তিশালী লেখকদের সারিতে তাঁকে ধরা হয়।

ছোটগল্পের গ্রন্থসমূহ

তাঁর গল্পগ্রন্থ সংখ্যায় পাঁচটি। পরীক্ষার জন্য প্রকাশের ক্রম মনে রাখা কাজে দেয়। নিচের সারণিতে বইগুলো সাজানো হলো।

গ্রন্থপ্রকাশকালমন্তব্য
অন্য ঘরে অন্য স্বর১৯৭৬তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ
খোয়ারি১৯৮২শিরোনাম-গল্পটি পুরোনো ঢাকার প্রেক্ষাপটে লেখা
দুধভাতে উৎপাত১৯৮৫গ্রামীণ দারিদ্র্য ও শোষণের ছবি এ বইয়ের গল্পে স্পষ্ট
দোজখের ওম১৯৮৯পারিবারিক ও মানসিক টানাপোড়েন প্রধান
জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল১৯৯৭তাঁর শেষ গল্পগ্রন্থ, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাস্তবতার ছাপ গভীর

প্রকাশের বছর নিয়ে কোনো সংস্করণে সামান্য ভিন্নতা থাকতে পারে, তাই পাঠ্যবইয়ে যে সাল দেওয়া আছে, পরীক্ষায় সেটিই মেনে চলুন।

গল্পে ফিরে ফিরে আসা প্রধান বিষয়

ইলিয়াসের গল্প একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা নয়, তবু কয়েকটি বিষয় বারবার ঘুরে আসে। পরীক্ষার উত্তর লেখার সময় এগুলোই আপনার কাঠামো হয়ে উঠতে পারে।

খেয়াল রাখবেন, তিনি কোনো মতবাদ প্রচার করার জন্য গল্প লেখেননি। সমালোচকেরা তাঁর লেখায় সমাজ-বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গি দেখেন ঠিকই, কিন্তু গল্পগুলো আগে মানুষের কথা বলে, তত্ত্ব তার পরে।

কয়েকটি গল্পের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

সবগুলো গল্পের আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। তবে সিলেবাসে প্রায়ই আসে, এমন কয়েকটির মূল ভাবনা এভাবে মনে রাখতে পারেন।

দুধভাতে উৎপাত

গ্রামীণ গরিব পরিবারের টানাটানি এ গল্পের কেন্দ্র। অভাব এমন জায়গায় পৌঁছায় যে সংসারের একমাত্র সম্বল, গরু, বন্ধক দিতে হয়। ফলে অসুস্থ মানুষের মুখে একটু দুধ জোটানোর সুযোগও থাকে না। শিরোনামের ব্যঙ্গাত্মক সুরটি লক্ষ করুন: যাদের পেটে ভাত নেই, তাদের কাছে দুধভাত বিলাসিতা, আর সেই বিলাসিতার আকাঙ্ক্ষাই যেন উৎপাত।

খোয়ারি

পুরোনো ঢাকার একটি বাড়িকে ঘিরে এ গল্পের পরিসর। স্বাধীনতার পর সেখানকার এক হিন্দু পরিবারের অনিশ্চয়তা আর বাড়ি দখল বা ভাড়ার নামে তরুণদের তৎপরতা গল্পের টানটান উত্তেজনা তৈরি করে। এখানে সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব-সংকট আর নগরের ক্ষমতাকাঠামো একসঙ্গে ধরা পড়ে।

দোজখের ওম

অসুস্থ এক বৃদ্ধ জীবনের পাপ-পুণ্যের হিসাব করতে বসেন, অন্যদিকে ঘরে সন্তানদের দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। গল্পটি একই সঙ্গে ব্যক্তির অপরাধবোধ ও পারিবারিক বন্ধনের ভঙ্গুরতার ছবি।

জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল ও মিলির হাতে স্টেনগান

এ দুই গল্পে মুক্তিযুদ্ধের পরের সময়ের বিভ্রান্তি ফুটে উঠেছে। একটিতে যুদ্ধের আদর্শের পতন ও সুবিধাভোগীর উত্থান, অন্যটিতে যুদ্ধফেরত মানুষের মানসিক বিপর্যয়। দুটিই দেখায়, স্বাধীনতার স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবের সামনে ফিকে হয়ে যায়।

গল্পের ঘটনাক্রম বা চরিত্রের নামের বানানে পাঠ্যবই ও সংস্করণভেদে পার্থক্য থাকতে পারে। উত্তর লেখার সময় নিজের হাতের বইয়ের বানান ও তথ্য ধরেই লিখুন।

ভাষা ও বর্ণনার ধরন

ইলিয়াসের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর গদ্যে। তিনি সাধু বা মার্জিত সাহিত্যিক ভাষার বদলে মানুষের মুখের ভাষা, অঞ্চলের টান, গালি, প্রবাদ আর কথার ভাঁজকে গল্পে জায়গা দিয়েছেন। চরিত্র যে পরিবেশের, তার ভাষাও সেই পরিবেশের। ফলে সংলাপ শুধু কথা নয়, চরিত্রের শ্রেণি, শিক্ষা আর মানসিক অবস্থার প্রমাণ হয়ে ওঠে।

তাঁর বর্ণনার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য:

সমালোচনামূলক মূল্যায়ন

সমালোচকদের মতে ইলিয়াস বাংলাদেশের গল্পে বাস্তবতার এক নতুন মাত্রা এনেছেন। রোমান্টিক আবেগ বা সরল নীতিকথার জায়গায় তিনি এনেছেন নির্মোহ পর্যবেক্ষণ। তাঁর গল্পে খলনায়ক আর নায়কের স্পষ্ট ভাগ থাকে না; দুর্বল মানুষও নিজের মতো করে অন্যায়ের অংশীদার হয়ে পড়ে। এটিই তাঁকে আধুনিক ও জটিল লেখক করে তুলেছে।

একই সঙ্গে কিছু পাঠক অভিযোগ করেন যে তাঁর ভাষা ও বাক্যগঠন সাধারণ পাঠকের জন্য ভারী। এই সীমাবদ্ধতা মেনেই বলা যায়, ভাষার এই জটিলতা তাঁর বিষয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, কারণ জটিল সমাজকে সরলভাবে বললে তার সত্যটাই হারিয়ে যেত। পরীক্ষার উত্তরে মূল্যায়ন লিখতে হলে দুই দিকই সংক্ষেপে উল্লেখ করা ভালো।

পরীক্ষার্থী হিসেবে গল্পগুলো কীভাবে পড়বেন

  1. প্রথমে ঘটনাটুকু বুঝে নিন। কে, কোথায়, কী করছে, কার সঙ্গে সম্পর্ক কী, এটুকু নিজের ভাষায় তিন-চার লাইনে লিখে ফেলুন।
  2. তারপর দ্বিতীয়বার ধীরে পড়ুন। এবার ভাষা, সংলাপ আর পরিবেশ-বর্ণনায় মন দিন। কঠিন বাক্য থামিয়ে ভেঙে ভেঙে পড়ুন।
  3. গল্পের সামাজিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি খুঁজুন। কোন সময়ের কথা বলা হচ্ছে এবং তখন দেশে কী ঘটছিল, তা জানলে অনেক ইঙ্গিত পরিষ্কার হয়।
  4. শিরোনামের অর্থ ভাবুন। তাঁর গল্পের নাম প্রায়ই ব্যঙ্গ বা প্রতীকে ভরা। শিরোনাম কেন সার্থক, এই প্রশ্ন পরীক্ষায় আসে।
  5. তুলনা করতে শিখুন। গ্রামের গল্প ও শহরের গল্প, কিংবা যুদ্ধের আগের ও পরের গল্প পাশাপাশি রেখে মিল-অমিল লিখলে উত্তর গভীর হয়।
  6. নিজের ভাষায় লিখুন। মুখস্থ সমালোচকের বাক্যের চেয়ে গল্প থেকে নেওয়া নির্দিষ্ট ঘটনা ও চরিত্রের উদাহরণ উত্তরকে বেশি জোরালো করে।
গল্পের কোনো অংশ হুবহু উদ্ধৃত করতে চাইলে নিজের পাঠ্যবই থেকে মিলিয়ে নিন। স্মৃতির ওপর ভরসা করে উদ্ধৃতি লিখলে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে; বরং ঘটনাটি নিজের ভাষায় বর্ণনা করাই নিরাপদ।

শেষ কথা

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের মনের এক বিশ্বস্ত দলিল। শ্রেণি-বৈষম্য, নগর-গ্রামের ভাঙন, যুদ্ধোত্তর হতাশা আর নারী ও সংখ্যালঘুর অবস্থান, সবকিছু এসেছে তাঁর নিজস্ব কঠিন অথচ জীবন্ত গদ্যে। গল্পগুলো একবারে পড়ে ফেলার নয়; ধীরে, একাধিকবার পড়লে তবেই তাদের ভেতরের স্তরগুলো খুলে যায়। সেই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি আপনি বাংলা কথাসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবেন।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্পের বই কয়টি?

তাঁর গল্পগ্রন্থ পাঁচটি: অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোয়ারি, দুধভাতে উৎপাত, দোজখের ওম এবং জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল।

ইলিয়াসের গল্পের প্রধান বিষয় কী?

মূলত শ্রেণি-বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের সংকট, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং মানুষের মানসিক টানাপোড়েন তাঁর গল্পের প্রধান বিষয়।

তাঁর গল্পের ভাষা কেমন?

ভাষা মুখের কথার কাছাকাছি, আঞ্চলিক টান ও খুঁটিনাটি বিবরণে ভরা। বাক্য প্রায়ই দীর্ঘ ও জটিল, আর সুরে ব্যঙ্গ ও সংযম দুটোই থাকে।

ইলিয়াস কি শুধু ছোটগল্পই লিখেছেন?

না, তিনি চিলেকোঠার সেপাই ও খোয়াবনামা নামে দুটি উপন্যাসও লিখেছেন, যা তাঁর খ্যাতির বড় ভিত্তি। প্রবন্ধও তিনি লিখেছেন।

পরীক্ষার জন্য তাঁর গল্প পড়ার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?

প্রথমে ঘটনা বুঝে নিয়ে পরে ভাষা, পটভূমি ও শিরোনামের অর্থ নিয়ে ভাবুন। নিজের ভাষায় সারাংশ ও তুলনামূলক নোট তৈরি করলে উত্তর লেখা সহজ হয়।