হাজার চুরাশির মা উপন্যাস: কাহিনি, চরিত্র ও বিশ্লেষণ

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · বাংলা সাহিত্য

সংক্ষেপেনকশাল আন্দোলনের উত্তাল সময়ে লেখা মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা উপন্যাসের কাহিনি, চরিত্র, বিষয়ভাবনা ও সাহিত্যিক মূল্য এখানে গুছিয়ে পাবেন।

একজন মা তাঁর মৃত ছেলের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে নিজের পরিবার আর গোটা সমাজের মুখোশ খুলে ফেলছেন, এই ভাবনাই হাজার চুরাশির মা উপন্যাসের প্রাণ। মহাশ্বেতা দেবীর এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে রাজনৈতিক সচেতনতা আর মানবিক বেদনার এক বিরল মিশেল। সাহিত্যের শিক্ষার্থী হিসেবে আপনাকে লেখিকার পরিচয়, ঐতিহাসিক পটভূমি, কাহিনি, চরিত্র, বিষয়বস্তু আর আখ্যানের গড়ন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। নিচে ধাপে ধাপে সেগুলোই আলোচনা করা হলো।

লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৯২৬ সালে ঢাকায়, মৃত্যু ২০১৬ সালে কলকাতায়। সাহিত্যচর্চার পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। তিনি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন, আবার একই সঙ্গে লিখেছেন এবং মাঠে নেমে কাজও করেছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আশপাশের অঞ্চলের আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষের জীবন তাঁর লেখার বড় জায়গা জুড়ে আছে। লোধা, শবর ও সাঁওতালদের মতো সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে তিনি লেখালেখির পাশাপাশি আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন।

তাঁর পরিচিত রচনার মধ্যে আছে ঝাঁসির রানী, অরণ্যের অধিকার ও শালগিরার ডাকে। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি, জ্ঞানপীঠ, ম্যাগসেসাই ও পদ্মবিভূষণের মতো সম্মান পেয়েছেন। মহাশ্বেতার লেখার বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাস, গবেষণা আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মিশ্রণ। তিনি সাহিত্যকে সমাজের পক্ষে দাঁড়ানোর হাতিয়ার বলে মনে করতেন।

পটভূমি: নকশাল আন্দোলন ও সত্তরের বাংলা

১৯৬৭ সালের মে মাসে দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি এলাকায় ভূমিহীন কৃষক ও জোতদারদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। সেই ঘটনার সূত্র ধরেই নকশালবাড়ি আন্দোলনের পরিচিতি। এর তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক নেতাদের মধ্যে চারু মজুমদার ও কানু সান্যাল ছিলেন অগ্রগণ্য। ১৯৬৯ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) গঠিত হয়। আন্দোলন গ্রাম থেকে শহরেও ছড়িয়ে পড়ে, আর কলকাতা ও আশপাশের বহু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ এতে জড়িয়ে যান।

রাষ্ট্র এই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করে। গ্রেপ্তার, বিনা বিচারে আটক, হেফাজতে নির্যাতন এবং ভুয়া সংঘর্ষে মৃত্যুর অভিযোগ তখন বারবার উঠেছে। অনেক পরিবারের কাছে ছেলের মৃত্যুর খবর আসত পুলিশের মাধ্যমে, আর সেই মৃত্যুর কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা মিলত না। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে, অর্থাৎ ঘটনার ঢেউ তখনো স্মৃতিতে টাটকা। এই পটভূমি না জানলে উপন্যাসের নীরবতা আর ক্ষোভ দুটোই অধরা থেকে যায়।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী, প্রকাশকাল ১৯৭৪, কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা, আর মৃতদেহের নম্বর ১০৮৪, যা থেকে নামকরণ।

কাহিনির রূপরেখা

উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কনিষ্ঠ পুত্র ব্রতী। এক রাতে সে পুলিশের হাতে নিহত হয়, আর তার মৃতদেহ কান্তাপুকুরের মর্গে অজ্ঞাত লাশ হিসেবে রাখা হয়। সেই লাশের নম্বর ১০৮৪। পরিবারের সম্মান বাঁচাতে বাবা দিব্যনাথ ঘটনাটি চাপা দিতে চান, খবরের কাগজে যেন নাম না ছাপা হয় সেই চেষ্টাও করেন। মা সুজাতা কিন্তু মর্গে গিয়ে ছেলের দেহ শনাক্ত করেন।

কাহিনি এগোয় সুজাতার ভেতরের বদলের পথ ধরে। এক বছর পরের দিনে দাঁড়িয়ে তিনি ফিরে তাকান অতীতের দিকে। বুঝতে চেষ্টা করেন, যে ছেলেটিকে তিনি নিজের কাছের মানুষ ভাবতেন, তার ভেতরের জগৎ কতটা অচেনা ছিল। ব্রতীর বন্ধুদের খোঁজ করতে গিয়ে তিনি নিহত সোমুর মা ও তার পরিবারের সংস্পর্শে আসেন। ব্রতীর সঙ্গী নন্দিনীর সঙ্গেও তাঁর দেখা হয়। এই মানুষগুলোর দুঃখ তাঁকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

উপন্যাসের শেষ দিকে তাঁর বড় মেয়ে তুলির বাগদান উপলক্ষে বাড়িতে উৎসবের আয়োজন হয়। সেখানে এমন সব অতিথি আসেন, যাঁদের চোখে ব্রতীর মৃত্যু কেবল সুবিধাজনক ভুলে যাওয়ার বিষয়। চারপাশের এই কৃত্রিম হাসিখুশি আর নীরবতা সুজাতার ভেতরের জমে থাকা যন্ত্রণাকে চূড়ান্ত বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়।

প্রধান চরিত্র ও তাদের ভূমিকা

চরিত্রপরিচয় ও ভূমিকা
সুজাতাকেন্দ্রীয় চরিত্র; ব্রতীর মা, ধীরে ধীরে নিজের নীরবতা ভাঙেন
ব্রতীসুজাতার ছোট ছেলে; আদর্শবাদী তরুণ, যার মৃত্যু উপন্যাসের সূচনাবিন্দু
দিব্যনাথসুজাতার স্বামী; সম্মান ও সুবিধার হিসাবে চলা বিত্তবান পিতা
নন্দিনীব্রতীর সঙ্গী; দৃঢ় ও সাহসী, রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সাক্ষী
সোমুর মানিম্নবিত্ত পরিবারের মা; সুজাতাকে শ্রেণিবিভাগের বাস্তবতা দেখান
তুলি, জ্যোতি, নীপাব্রতীর ভাইবোন; আত্মতুষ্ট মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিনিধি

চরিত্রগুলোর মধ্যে সুজাতাই সবচেয়ে গতিশীল। শুরুতে তিনি স্বামী, সন্তান আর সংসারের চাপে চুপ করে থাকা এক নারী। কিন্তু ছেলের মৃত্যু তাঁকে প্রশ্ন করতে শেখায়। অন্যদিকে দিব্যনাথ এবং বাকি সন্তানরা সেই শ্রেণির প্রতিনিধি, যারা আরামের জীবন ধরে রাখতে সত্যকে এড়িয়ে চলে। ব্রতীকে লেখিকা সরাসরি মঞ্চে বেশি আনেননি। সে উপস্থিত থাকে স্মৃতি আর অন্যদের কথায়, তাই তার অনুপস্থিতিই কাহিনির সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।

বিষয়বস্তু ও মূল ভাবনা

উপন্যাসটি একসঙ্গে কয়েকটি স্তরে কাজ করে। সেগুলো আলাদা করে দেখে নিলে পরীক্ষার উত্তর সাজানো সহজ হয়:

পরীক্ষায় তুলনামূলক প্রশ্নও আসতে পারে। যেমন, সুজাতা আর সোমুর মায়ের অবস্থানের পার্থক্য কোথায়, সেটা ভাবতে পারেন। একজনের ঘরে স্বচ্ছলতা ছিল কিন্তু সত্য বলার জায়গা ছিল না, আরেকজনের ঘরে অভাব ছিল কিন্তু শোকের ভাগীদার ছিল আশপাশের মানুষ। এই দুই মায়ের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্য থেকেই বোঝা যায়, শ্রেণির দূরত্ব কেবল টাকার হিসাবে নয়, দুঃখ প্রকাশের সুযোগেও ধরা পড়ে। এ কারণেই সুজাতার যাত্রাকে অনেকেই একজন মধ্যবিত্ত নারীর চেতনার জাগরণ হিসেবে পড়েন।

আরেকটি দিক হলো পরিবারের ভেতরের আচরণ। দিব্যনাথ ও অন্য সন্তানরা ব্রতীর মৃত্যুকে ব্যক্তিগত শোকের চেয়ে সামাজিক অস্বস্তি হিসেবে দেখে। তাদের কাছে প্রশ্ন একটাই, লোকে কী বলবে। এই মনোভাবের মধ্য দিয়ে লেখিকা দেখিয়েছেন, অন্যায় শুধু পুলিশের লাঠিতে ঘটে না, ঘরের দেয়ালের ভেতরের নীরবতাতেও তার জায়গা থাকে।

আখ্যানকৌশল ও ভাষা

উপন্যাসের গঠন সরলরৈখিক নয়। কাহিনির বর্তমান সময় সীমিত, কিন্তু সুজাতার স্মৃতিতে বারবার অতীত ফিরে আসে। এই ফিরে দেখার কৌশলে পাঠক ঘটনার ক্রম নয়, চরিত্রের মনের পরিবর্তনটাই বেশি অনুভব করেন। কাহিনি আবর্তিত হয় মূলত একটি দিন ও তার আগের-পরের স্মৃতিকে ঘিরে, ফলে ঘটনার তীব্রতা ঘনীভূত থাকে।

ভাষা অলংকারবর্জিত, ছোট ছোট বাক্যে গড়া এবং অনেক জায়গায় প্রায় প্রতিবেদনের মতো শীতল। কিন্তু এই শীতলতাই আবেগকে আরও জোরালো করে তোলে। লেখিকা শোককে নাটকীয় বক্তৃতায় না সাজিয়ে সরাসরি তথ্য আর দৃশ্যের মধ্য দিয়ে হাজির করেছেন। নামকরণও কৌশলী। মানুষটির নামের বদলে একটি সংখ্যাকে শিরোনামে রাখা বোঝায়, রাষ্ট্রের চোখে একজন তরুণ কেবল একটি নম্বরে পরিণত হয়েছিল, আর মা সেই সংখ্যাকেই নিজের পরিচয় করে নিয়েছেন।

সাহিত্যিক গুরুত্ব ও রূপান্তর

বাংলা কথাসাহিত্যে এই উপন্যাসকে নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা অন্যতম আলোচিত রচনা বলা যায়। তবে একে “প্রথম” বলে দাবি করার আগে সতর্ক হওয়া ভালো, কারণ এ নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া মন্তব্য করা ঠিক নয়। এর শক্তি এখানে যে, আন্দোলনের তত্ত্ব বা কৌশল নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে লেখিকা এক মায়ের চোখ দিয়ে সময়টাকে দেখেছেন। তাই রাজনৈতিক মতের অমিল থাকলেও পাঠক চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন।

উপন্যাসটি পরে অন্য মাধ্যমেও এসেছে। ১৯৯৮ সালে গোবিন্দ নিহালনি এটি অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় “হাজার চুরাশি কী মা” চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন, যেখানে সুজাতার ভূমিকায় ছিলেন জয়া বচ্চন। ভারতের অন্যান্য ভাষাতেও উপন্যাসটির অনুবাদ হয়েছে, আর ইংরেজি অনুবাদ বিদেশি পাঠকের কাছেও লেখিকার পরিচিতি বাড়াতে সাহায্য করেছে।

শেষ কথা

হাজার চুরাশির মা কোনো সহজ উত্তর দেয় না, বরং পাঠককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রাষ্ট্র, পরিবার আর সমাজ কীভাবে একজন তরুণের মৃত্যুকে বিস্মৃত করতে চায়, আর একজন মা কীভাবে সেই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ান, এটাই এর কেন্দ্রীয় আবেদন। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে পটভূমি, প্রধান চরিত্র, নামকরণের তাৎপর্য আর মধ্যবিত্তের ভূমিকা বিষয়ক আলোচনা গুছিয়ে রাখুন। আর নির্দিষ্ট তারিখ বা তথ্য লেখার আগে আপনার পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে নেবেন।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

হাজার চুরাশির মা উপন্যাসের লেখক কে?

উপন্যাসটির লেখক মহাশ্বেতা দেবী। এটি ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের নামে ১০৮৪ সংখ্যাটির অর্থ কী?

১০৮৪ হলো কান্তাপুকুরের মর্গে রাখা ব্রতীর মৃতদেহের নম্বর। রাষ্ট্রের চোখে একজন তরুণ কীভাবে শুধু সংখ্যায় পরিণত হয়, নামকরণে সেটাই ধরা পড়েছে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কে?

কেন্দ্রীয় চরিত্র সুজাতা, নিহত ব্রতীর মা। ছেলের মৃত্যুর পর তাঁর নীরবতা ভেঙে নিজের পরিবার ও সমাজকে নতুন করে চেনার যাত্রাই কাহিনির মূল সুর।

উপন্যাসটি কোন ঐতিহাসিক পটভূমিতে লেখা?

এটি সত্তরের দশকের শুরুর নকশাল আন্দোলন ও তার রাষ্ট্রীয় দমনের পটভূমিতে লেখা। আন্দোলনের সূচনা ১৯৬৭ সালে দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি থেকে।

হাজার চুরাশির মা অবলম্বনে কোনো চলচ্চিত্র হয়েছে কি?

হ্যাঁ, ১৯৯৮ সালে গোবিন্দ নিহালনি এটি অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় “হাজার চুরাশি কী মা” নামে ছবি পরিচালনা করেন। সুজাতার চরিত্রে অভিনয় করেন জয়া বচ্চন।