বিড়াল প্রবন্ধের মূলভাব, সারাংশ ও প্রশ্নোত্তর

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ · এইচএসসি

সংক্ষেপেবিড়াল প্রবন্ধের সারকথা, মূলভাব, প্রতীক, রচনাশৈলী আর পরীক্ষার জন্য অনুশীলনী প্রশ্নোত্তর এই লেখায় গুছিয়ে দেওয়া হলো।

বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বই খুললে যে কয়টা লেখা পড়তে গিয়ে সত্যিই হাসি পায়, "বিড়াল" তার একটি। অথচ হাসতে হাসতেই শেষ দিকে এসে মনটা একটু খচখচ করে। বঙ্কিমচন্দ্র ঠিক এই কাজটাই করতে চেয়েছিলেন। একদিকে নেশাখোর এক মানুষের আজগুবি কথোপকথন, অন্যদিকে সমাজের এমন এক ক্ষত, যেটা নিয়ে সরাসরি বললে কেউ কান দিত না। পরীক্ষার খাতায় প্রশ্ন আসে মূলভাব, প্রতীক আর কমলাকান্তের চরিত্র নিয়ে। এই লেখায় সেগুলোই একে একে গুছিয়ে বলা হলো।

লেখক ও রচনার পরিচয়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মেছিলেন ১৮৩৮ সালে, মারা যান ১৮৯৪-এ। সরকারি চাকরি সামলে তিনি যে পরিমাণ লিখেছেন, ভাবলে অবাক লাগে। দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, আনন্দমঠের লেখক বলেই তাঁকে বেশি চেনা যায়, কিন্তু প্রবন্ধেও তাঁর হাত কম পাকা ছিল না। নিজের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন পত্রিকা বের করে তিনি বাংলা গদ্যে নতুন একটা আসর বসিয়েছিলেন।

"বিড়াল" কমলাকান্তের দপ্তর নামের রচনাসংকলনের একটি লেখা। কমলাকান্ত চক্রবর্তী বলে একজন মানুষ, যিনি আফিম খান, সংসারের হিসাব রাখেন না, অথচ চারপাশের সবকিছু নিয়ে তাঁর ভাবনার শেষ নেই। এই চরিত্রের কাঁধে বন্দুক রেখে বঙ্কিম সমাজ, রাজনীতি আর মানুষের স্বভাব নিয়ে যা খুশি বলতে পেরেছেন। বিষয়টা মনে রাখা দরকার, কারণ প্রশ্নে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয় লেখক নিজে কথা বলছেন, নাকি কমলাকান্ত।

প্রবন্ধের সারাংশ

ঘটনা ছোট। কমলাকান্ত নিজের মতো করে বসে আছেন, এমন সময় একটি বিড়াল এসে তাঁর জন্য রাখা দুধ খেয়ে ফেলে। তিনি চটে যান, শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু বিড়াল পালিয়ে যায় না, উল্টে কথা বলতে শুরু করে। এ পর্যন্ত পড়ে মনে হতে পারে নিছক মজার গল্প। আসল প্যাঁচটা শুরু হয় তারপর।

বিড়াল নিজের পক্ষে সওয়াল করে। তার বক্তব্যের সারকথা হলো, ক্ষুধার্ত প্রাণী খাবার খুঁজবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং প্রশ্ন করা উচিত, যাঁদের ভাঁড়ার ভরা তাঁরা কেন অন্যের খিদের দিকে তাকান না। যে মানুষের পেট ভরা, সে চুরিকে খুব সহজে অপরাধ বলে দেয়, কিন্তু না-খেয়ে থাকার কষ্ট সে নিজে কখনো টের পায়নি। কমলাকান্ত তর্কে জিততে পারেন না, ভেতরে ভেতরে মেনে নেন যে কথাগুলোয় ফাঁক কম। রাগ যেখানে ছিল, সেখানে জায়গা করে নেয় একটা অস্বস্তি।

লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, গল্পে কোনো নাটকীয় মোড় নেই, কোনো জয়-পরাজয়ের ঘোষণা নেই। বিড়াল বক্তা, কমলাকান্ত শ্রোতা, আর প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে পাঠকের ঘরেই।

প্রতীক ও চরিত্র

চারটি উপাদান গুছিয়ে মনে রাখলে প্রায় সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়।

চরিত্র বা উপাদানপ্রতীকী অর্থ ও বৈশিষ্ট্য
কমলাকান্তআত্মভোলা, রসিক, চিন্তাশীল; লেখকের ভাবনার বাহক
বিড়ালক্ষুধার্ত, বঞ্চিত ও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি
দুধবেঁচে থাকার মৌলিক খাবার, যা সবার নাগালে নেই
ধনী সমাজপ্রয়োজনের বেশি জমানো আর অন্যের অভাবে উদাসীন শ্রেণি

বিড়াল কীসের প্রতীক

গরিব, অবহেলিত, ক্ষুধার্ত মানুষের। এখানে একটা সূক্ষ্ম কৌশল আছে। কোনো মানুষ চরিত্রকে দিয়ে এ কথা বলালে সেটা হতো সরাসরি অভিযোগ, কারও না কারও গায়ে লাগত। বিড়ালের মুখে বসানোয় কথাগুলো একই সঙ্গে হালকা আর ধারালো হয়ে উঠেছে। পাঠক হাসে, তারপর আবিষ্কার করে হাসিটা কার দিকে ঘুরে গেছে।

কমলাকান্তের ভূমিকা

শুরুতে তিনি রাগী গৃহস্থ, নিজের জিনিসের ওপর অধিকার নিয়ে সচেতন। শেষে তিনি এমন একজন শ্রোতা, যিনি অন্যের যুক্তি শুনতে জানেন। এই বদলটাই লেখার মেরুদণ্ড। পাঠক কমলাকান্তের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখলে বুঝতে পারে, তার প্রথম প্রতিক্রিয়াও হয়তো ওই রাগটাই হতো।

প্রবন্ধের মূলভাব

সংক্ষেপে বললে, সম্পদের অসম বণ্টন আর তার ফলে তৈরি হওয়া বঞ্চনার সমালোচনা। কারও হাতে প্রয়োজনের অনেক বেশি, কারও হাতে কিছুই নেই, আর যার নেই সে যদি নিজের হাতে কিছু তুলে নেয় তখন সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়ে শাস্তি দিতে। বঙ্কিম এখানে প্রশ্ন তুলছেন বিচারের মাপকাঠি নিয়ে। কাজটা কী, সেটা দেখলেই কি যথেষ্ট, নাকি কাজটা কোন অবস্থায় করা হলো সেটাও দেখা দরকার।

মূলভাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কয়েকটা স্তর।

একটা ভুল পরীক্ষার্থীদের খুব হয়। "প্রবন্ধে চুরিকে সমর্থন করা হয়েছে" লিখলে নম্বর কাটা যায়। লেখক সমর্থন করছেন না, তিনি চুরির পেছনের কারণের দিকে তাকাতে বলছেন।

ভাষা ও রচনাশৈলী

ভাষা সাধু রীতির, তবু পড়তে গিয়ে আড়ষ্ট লাগে না। কারণ গোটা লেখাটাই আসলে কথোপকথন, আর কথার ভেতরে একটা ছন্দ আছে। বিড়ালের যুক্তি সাজানোর ভঙ্গি অনেকটা আদালতে উকিলের সওয়ালের মতো: পয়েন্টের পর পয়েন্ট, প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার চেষ্টা। অথচ বক্তা একটা বিড়াল, আর শ্রোতা আধা-ঘুমন্ত নেশাখোর। এই অসংগতি থেকেই হাসি আসে।

নেশার ঘোরে দেখা বা শোনা দৃশ্যের কাঠামোটাও কাজের। সবকিছুই যেহেতু একজন খেয়ালি মানুষের কল্পনা বলে ধরা যায়, লেখক সরাসরি দায় নেন না, অথচ কথাগুলো বলা হয়ে যায়। উনিশ শতকে প্রকাশিত একটি লেখা যে আজও ক্লাসরুমে পড়ানো হয়, তার একটা কারণ হয়তো এই যে বক্তৃতার সুর কোথাও নেই।

পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে কিছু কথা

অনেকে প্রবন্ধটা মুখস্থ করতে বসে, কিন্তু এ লেখা মুখস্থ করার চেয়ে গুছিয়ে বলতে পারার। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন: ঘটনা তিন লাইনে বলতে পারি? বিড়াল কেন প্রতীক, দুই বাক্যে বোঝাতে পারি? পারলে প্রস্তুতি মোটামুটি হয়ে গেছে।

সৃজনশীল প্রশ্নে সাধারণত একটা উদ্দীপক থাকে, যেখানে কেউ অভাবের কারণে কিছু একটা করে ফেলেছে বা ধনী-গরিবের ব্যবধান ফুটে উঠেছে। তখন প্রবন্ধের মূলভাবের সঙ্গে মিলটা আগে লিখুন, তারপর পার্থক্য। কমলাকান্তের দপ্তরের ঘরানা, অর্থাৎ ব্যঙ্গ আর খেয়ালি কথকের ব্যাপারটা উদ্দীপকে সাধারণত থাকে না, ওটাই অমিলের ভালো জায়গা।

অনুশীলনের প্রশ্নোত্তর

উত্তরগুলো নিজের ভাষায় লেখা, বোঝার সুবিধার জন্য। পরীক্ষায় লেখার আগে পাঠ্যবই একবার মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

জ্ঞানমূলক প্রশ্ন

  1. "বিড়াল" প্রবন্ধের লেখক কে? উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
  2. প্রবন্ধটি কোন রচনাসংকলনের অংশ? উত্তর: কমলাকান্তের দপ্তর।
  3. প্রবন্ধের কথক কে? উত্তর: কমলাকান্ত চক্রবর্তী।
  4. বঙ্কিমচন্দ্র কোন পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন? উত্তর: বঙ্গদর্শন।

অনুধাবনমূলক প্রশ্ন

  1. কমলাকান্ত শুরুতে বিড়ালের ওপর রেগে যান কেন? উত্তর: বিড়াল তাঁর জন্য রাখা দুধ খেয়ে ফেলেছিল। নিজের জিনিস নষ্ট হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হন।
  2. বিড়াল নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে কী বলে? উত্তর: সে বলে ক্ষুধার্ত প্রাণীর খাবার খোঁজা স্বাভাবিক। আর যাঁদের কাছে প্রয়োজনের বেশি আছে অথচ অভাবীকে দেন না, তাঁদের উদাসীনতাও দায়ী।
  3. কমলাকান্তকে এই প্রবন্ধে মুখপাত্র করার সুবিধা কী? উত্তর: কমলাকান্ত খেয়ালি ও নেশাগ্রস্ত চরিত্র বলে তাঁর মুখ দিয়ে ব্যঙ্গ ও কঠিন সমালোচনা সহজে বলা যায়, লেখককে সরাসরি দায় নিতে হয় না।

বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন

  1. বিড়ালকে বঞ্চিত মানুষের প্রতীক বলা যায় কি? উত্তর: যায়। তার ক্ষুধা, অভাব আর আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি সমাজের সাধারণ বঞ্চিত মানুষের অবস্থাকেই প্রকাশ করে।
  2. প্রবন্ধে ব্যঙ্গের ভূমিকা কী? উত্তর: ব্যঙ্গ কঠিন সামাজিক সমালোচনাকে সহজে গ্রহণযোগ্য করেছে এবং পাঠককে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।
  3. কমলাকান্তের মনোভাবের পরিবর্তন প্রবন্ধের মূলভাবকে কীভাবে ফুটিয়ে তোলে? উত্তর: ক্ষোভ থেকে সহানুভূতির দিকে তাঁর সরে আসা দেখায় যে অভাবের কারণ বুঝলে বিচারের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। এটাই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় বার্তা।

উত্তর লেখার একটা সহজ নিয়ম আছে। আগে সরাসরি বক্তব্য, তারপর প্রবন্ধের ঘটনা বা যুক্তি থেকে একটি উদাহরণ, শেষে এক-দুই লাইনের সমাপ্তি। সৃজনশীল প্রশ্নে মিল আর অমিল আলাদা অনুচ্ছেদে দিলে পরীক্ষক সহজে নম্বর দিতে পারেন।

শেষ কথা

বিড়াল পড়া শেষ করে একটা কথাই মাথায় ঘোরে: ন্যায্যতা আসলে কার পক্ষে মাপা হয়। বঙ্কিম উত্তর দেননি, প্রশ্নটা রেখে গেছেন। প্রস্তুতির জন্য চারটি জিনিস হাতে রাখুন, লেখকের পরিচয়, ঘটনার ক্রম, প্রতীকের অর্থ আর মূলভাব। তারপর বইটা বন্ধ করে নিজের মুখে একবার পুরোটা বলে ফেলুন। যেখানে আটকাবেন, সেখানেই আবার ফিরে যেতে হবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

বিড়াল প্রবন্ধের লেখক কে?

বিড়াল প্রবন্ধের লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এটি তাঁর কমলাকান্তের দপ্তর রচনাগুচ্ছের অন্তর্গত।

বিড়াল প্রবন্ধের মূলভাব কী?

মূলভাব হলো সম্পদের অসম বণ্টন ও সামাজিক বঞ্চনার সমালোচনা। ক্ষুধার্তের কাজকে বিচার করতে হবে তার অবস্থার কারণ বুঝে।

বিড়াল প্রবন্ধে বিড়াল কীসের প্রতীক?

বিড়াল সমাজের ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত ও সাধারণ মানুষের প্রতীক। তার খাবার নেওয়া বেঁচে থাকার তাগিদ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কমলাকান্ত কে?

কমলাকান্ত চক্রবর্তী বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট আফিমখোর, খেয়ালি ও চিন্তাশীল চরিত্র, যার মুখ দিয়ে লেখক সমাজ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন।

বিড়াল প্রবন্ধ কোন শ্রেণিতে পড়ানো হয়?

প্রবন্ধটি এইচএসসি স্তরের বাংলা গদ্য পাঠ্যের অংশ। এখান থেকে সৃজনশীল, অনুধাবনমূলক ও বহুনির্বাচনি প্রশ্ন আসে।