বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব, চরিত্র ও নায়ক-বিতর্ক
বাংলা গদ্যসাহিত্যের আলোচনায় বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব নিয়ে প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায় ফিরে ফিরে আসে। মীর মশাররফ হোসেনের এই বিখ্যাত গ্রন্থ কারবালার করুণ ঘটনাকে ঘিরে লেখা, কিন্তু পড়তে বসলে বোঝা যায় এটি শুধু ইতিহাস শোনানোর বই নয়। এখানে ক্ষমতার লোভ, ষড়যন্ত্র, আত্মত্যাগ আর শোকের একটি বিস্তৃত কাহিনি গড়ে উঠেছে। এই লেখায় লেখক, পটভূমি, গঠন, মূলভাব, নায়ক-বিতর্ক, চরিত্র ও ভাষারীতি ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হলো।
লেখক পরিচিতি
মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭–১৯১১) উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য লেখক। তাঁর জন্ম কুষ্টিয়া অঞ্চলের কুমারখালী এলাকায়। তিনি উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা ও আত্মজীবনীমূলক রচনায় হাত দিয়েছিলেন। তাঁর রত্নবতী, জমিদার দর্পণ, গো-জীবন ও আমার জীবনী নামের রচনাগুলো আজও আলোচনায় আসে। জমিদার দর্পণ নাটকে তিনি জমিদারের অত্যাচার তুলে ধরেছিলেন, যা সেই সময়ের জন্য সাহসী কাজ ছিল।
তবে পাঠকমহলে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় বিষাদ সিন্ধু। এই একটি বই তাঁকে মুসলিম লেখকদের মধ্যে বাংলা গদ্যচর্চার এক প্রধান নাম করে তুলেছে। অনেকেই তাঁকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষের লেখক হিসেবে মনে রাখেন, কারণ তাঁর লেখায় সব ধর্মের প্রতি সম্মানের সুর পাওয়া যায়।
কারবালার পটভূমি
উপন্যাসের পেছনের ঘটনাটি ইসলামের প্রথম শতাব্দীর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে জড়িত। উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়ার পর তাঁর পুত্র ইয়াজিদ (গ্রন্থে এজিদ) ক্ষমতায় আসেন। নবীজির দৌহিত্র ইমাম হোসেন এই ক্ষমতা হস্তান্তরকে মেনে নেননি। কুফাবাসীর আহ্বানে তিনি সপরিবারে সেদিকে রওনা হন, কিন্তু পথে কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদের বাহিনীর মুখোমুখি হন। মহররমের দশম দিনে (খ্রিষ্টীয় ৬৮০ সাল, হিজরি ৬১) সেখানে হোসেন ও তাঁর অল্প কয়েকজন সঙ্গী শহীদ হন। এই দিনটি আশুরা নামে মুসলিম বিশ্বে শোকের স্মৃতি বহন করে।
এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি। বিষাদ সিন্ধু ইতিহাসের পাঠ্যবই নয়, এটি সাহিত্য। লেখক প্রচলিত আখ্যান, কাহিনি ও পূর্বসূরিদের বর্ণনা থেকে উপকরণ নিয়েছেন এবং নিজের কল্পনায় বহু ঘটনা, সংলাপ ও চরিত্রের মনস্তত্ত্ব যোগ করেছেন। তাই উপন্যাসে যা পড়ছেন, তার সবটুকু ঐতিহাসিক সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ইতিহাস জানতে আলাদা ইতিহাসগ্রন্থ পড়তে হবে, আর সাহিত্য হিসেবে বইটিকে বুঝতে হবে শিল্পের দৃষ্টিতে।
গ্রন্থের গঠন
বিষাদ সিন্ধু একটানা লেখা একটি বই নয়, তিনটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছিল। এই তিন পর্ব আলাদা করে মনে রাখলে কাহিনির গতি বোঝা সহজ হয়।
| পর্ব | প্রকাশকাল | মোটামুটি বিষয় |
|---|---|---|
| মহররম পর্ব | ১৮৮৫ | মুয়াবিয়া ও এজিদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, হাসানের মৃত্যুর ষড়যন্ত্র, দ্বন্দ্বের সূচনা |
| উদ্ধার পর্ব | ১৮৮৭ | হোসেনের পরিবারকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ, দ্বন্দ্বের তীব্রতা ও কারবালার পথে যাত্রা |
| এজিদ বধ পর্ব | ১৮৯১ | কারবালার বিপর্যয়ের পরবর্তী ঘটনা ও এজিদের পরিণতি |
প্রকাশের বছরগুলো নিয়ে কোনো কোনো সূত্রে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, তাই পরীক্ষার আগে আপনার পাঠ্যবইয়ের তারিখ মিলিয়ে নেবেন। পর্বের নামগুলো লক্ষ করলে দেখবেন, শুরুটা শোকের মাসের নামে আর শেষটা অন্যায়কারীর পরিণতিতে। অর্থাৎ কাহিনি দুঃখ থেকে শুরু হয়ে একধরনের নৈতিক বিচারে গিয়ে থামে।
উপন্যাসের মূলভাব
বইটির মূলভাব একটি বাক্যে বলা কঠিন, কারণ এতে একাধিক সুর মিশে আছে। তবু প্রধান কয়েকটি দিক আলাদা করে বলা যায়।
- অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল থাকা। হোসেন জানতেন প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, তবু তিনি নিজের নীতি ছাড়েননি। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর এই দৃঢ়তা কাহিনির নৈতিক কেন্দ্র।
- ক্ষমতার লোভ ও তার ধ্বংসাত্মক রূপ। এজিদ ও তার সহযোগীরা ক্ষমতা আর ব্যক্তিগত বাসনা মেটাতে একের পর এক অন্যায় করে।
- ষড়যন্ত্রের পরিণাম। গোপন চক্রান্ত কীভাবে পরিবার ও সমাজকে ভেঙে দেয়, কাহিনিতে তা বারবার দেখা যায়।
- শোক ও আত্মত্যাগ। নাম বিষাদ সিন্ধু, অর্থাৎ দুঃখের সাগর। কাহিনির প্রায় সবটাই বেদনার আবহে ভরা, আর তার ভেতর দিয়ে ত্যাগের মহিমা ফুটেছে।
- মানবিক দুর্বলতা। লেখক শুধু সাদা-কালোয় চরিত্র আঁকেননি। প্রেম, ঈর্ষা, প্রতিহিংসা ও অনুশোচনার মতো মানবিক আবেগও কাহিনিকে নাড়া দিয়েছে।
মোটকথা, এটি বিজয়ের কাহিনি নয়, বরং পরাজয়ের ভেতর দিয়ে নৈতিক জয়ের কাহিনি।
পরীক্ষায় মূলভাব লিখতে বসলে একটি কাঠামো মেনে চলতে পারেন। প্রথমে কাহিনির পটভূমি এক-দুই বাক্যে বলুন। তারপর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্র, এরপর ন্যায়ের পক্ষে আত্মত্যাগ, সবশেষে শোকের আবহ ও পাঠকের ওপর তার প্রভাব তুলে ধরুন। প্রতিটি দিকের সঙ্গে গ্রন্থের একটি করে ঘটনা বা চরিত্রের উদাহরণ জুড়ে দিলে উত্তর আরও গোছানো ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। মনে রাখবেন, শুধু ঘটনার সারাংশ লিখলে মূলভাব লেখা হয় না, ঘটনার পেছনের বার্তাটাই আসল।
নায়ক কে: বিতর্কের নানা মত
এই প্রশ্নের একটিমাত্র সর্বজনস্বীকৃত উত্তর নেই। পরীক্ষায় লেখার সময় যুক্তি দিয়ে একটি মত বেছে নিতে হয়, আর সেজন্য প্রচলিত তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি জানা দরকার।
হোসেনকে নায়ক ধরা
অনেকে বলেন, মহত্ত্ব, সাহস, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের বিচারে হোসেনই কাহিনির আদর্শ নায়ক। কারবালার পরিণতি তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত, আর পাঠকের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতিও তাঁর দিকে। তবে সমস্যা হলো, উপন্যাসের বড় অংশজুড়ে ঘটনার চালিকাশক্তি তিনি নন, তিনি ঘটনার শিকার।
এজিদকে কেন্দ্রীয় চরিত্র ধরা
আরেক দল সমালোচকের মতে, কাহিনির গতি যে চরিত্রের ইচ্ছা ও কাজে এগোয়, তাকেই কেন্দ্রে রাখা উচিত, আর সে হলো এজিদ। তার প্রতিহিংসা, জেদ ও অন্তর্দ্বন্দ্বই একের পর এক ঘটনা ঘটায়। নৈতিকভাবে সে নায়ক নয়, কিন্তু নাট্যিক বিচারে সে প্রতিনায়ক বা কেন্দ্রীয় চরিত্রের মতো কাজ করে। আবার তার শেষ পরিণতি ও অনুশোচনার ছায়া দেখিয়ে লেখক তাকে একেবারে একরঙা খলনায়ক করে রাখেননি, এই দিকটিও সমালোচকেরা উল্লেখ করেন।
কোনো একক নায়ক নেই, এই মত
তৃতীয় মত অনুযায়ী, বইটি আসলে একটি বড় ঘটনার বিবরণ, যেখানে কোনো একজন চরিত্র একাই নায়ক নন। হাসান, হোসেন, জয়নাব ও অন্যরা মিলে সামগ্রিক ট্র্যাজেডির অংশ। আপনি যে মতই বেছে নিন, পরীক্ষার খাতায় যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে তা সমর্থন করুন, তাহলেই উত্তর শক্ত হবে।
প্রধান চরিত্র
উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে কয়েকটি ভাগে সাজিয়ে দেখলে মনে রাখা সহজ হয়।
- হোসেন: ন্যায়নিষ্ঠ, সাহসী ও আত্মত্যাগী নেতা। কারবালার প্রধান ব্যক্তিত্ব।
- হাসান: হোসেনের অগ্রজ, শান্তিপ্রিয় ও উদার। উপন্যাসের কাহিনিতে তাঁর মৃত্যু বড় মোড় এনে দেয়।
- এজিদ: উচ্চাকাঙ্ক্ষী, জেদি ও প্রতিহিংসাপরায়ণ। প্রতিপক্ষ হলেও কাহিনির গতির জন্য তার ভূমিকা অপরিহার্য।
- জয়নাব: কাহিনির এক গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র, যাকে ঘিরে এজিদের আকর্ষণ ও সংঘাতের সূচনা। উপন্যাসের এই ঘটনাপ্রবাহ লেখকের কল্পনাপ্রসূত বলে বিবেচিত হয়।
- জায়েদা: হাসানের স্ত্রী, যে প্রলোভনে পড়ে ভুল পথে যায়। তার ট্র্যাজেডি লোভ ও অনুশোচনার চিত্র।
- মারওয়ান ও মায়মুনা: ষড়যন্ত্রের কুশীলব, যাদের কৌশল ও চক্রান্ত কাহিনিতে সংকট বাড়ায়।
- মুয়াবিয়া: এজিদের পিতা ও তৎকালীন শাসক, যিনি ক্ষমতার পটভূমি তৈরি করেন।
চরিত্রের ভূমিকা ও ঘটনার ধারাবাহিকতা সংস্করণ ও ব্যাখ্যাভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করার সময় আপনার পাঠ্যবই বা মূল গ্রন্থ দেখে নেওয়া নিরাপদ।
ভাষা, শৈলী ও বাংলা গদ্যে স্থান
বইটির ভাষা সাধু বাংলা, তবে সাধারণ সাধু ভাষার চেয়ে এখানে আবেগের মাত্রা বেশি। বর্ণনায় কাব্যিক ভঙ্গি, দীর্ঘ বাক্য আর শোকাবহ আবহ চোখে পড়ে। সাধু বাংলার সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের মিশ্রণ এই লেখায় বিশেষ স্বাদ এনেছে। গদ্যের পাশাপাশি মাঝে মাঝে পদ্যের ব্যবহারও করা হয়েছে, যা পুঁথিসাহিত্যের পুরোনো ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
বর্ণনার দিক থেকে লেখক ঘটনাকে নাটকীয় করে তুলতে পারতেন। সংলাপ, দৃশ্যবিন্যাস ও আবেগঘন মুহূর্ত পাঠককে কাহিনির ভেতরে টেনে নেয়। কেউ কেউ কাহিনির অতিনাটকীয়তা বা অলৌকিক উপাদানকে সীমাবদ্ধতা মনে করেন, আবার অনেকে একে সে যুগের কথকতার ধারার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন।
বাংলা গদ্যের ইতিহাসে বইটির গুরুত্ব বেশ বড়। বিষয়বস্তুর কারণে এটি বহু মুসলিম পাঠকের কাছে পৌঁছেছিল, আর বাংলা গদ্যে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনির সাহিত্যিক রূপায়ণের এক শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে আছে। এটি বঙ্কিমচন্দ্র-পরবর্তী সময়ের গদ্যচর্চার মধ্যে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে। তবু একে কেবল মুসলিম সমাজের লেখা বলে সীমিত করে দেখা ঠিক নয়, কারণ এর শিল্পগুণ সব পাঠকের কাছেই আবেদন রাখে।
শেষ কথা
বিষাদ সিন্ধু ইতিহাসের ছায়া ও কল্পনার রঙে গড়া এক বেদনার মহাকাব্যধর্মী কাহিনি। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে লেখকের পরিচয়, তিন পর্বের নাম, মূলভাবের প্রধান দিকগুলো, নায়ক নিয়ে মতভেদ, চরিত্রের পরিচিতি এবং ভাষারীতি, এই ছয়টি বিষয় গুছিয়ে পড়ে নিন। ঘটনার খুঁটিনাটি ও সাল লেখার সময় আপনার নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের তথ্য অনুসরণ করুন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের রচয়িতা কে?
বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন। তিনি উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক।
বিষাদ সিন্ধু কয়টি পর্বে বিভক্ত?
গ্রন্থটি তিনটি পর্বে প্রকাশিত হয়: মহররম পর্ব, উদ্ধার পর্ব ও এজিদ বধ পর্ব। পর্বগুলো ১৮৮০-র দশক ও ১৮৯১ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়।
বিষাদ সিন্ধুর মূলভাব কী?
মূলভাব হলো ক্ষমতার লোভ ও ষড়যন্ত্রের বিপরীতে ন্যায়, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের মহিমা। এর সঙ্গে শোক ও মানবিক দুর্বলতার চিত্রও রয়েছে।
বিষাদ সিন্ধুর নায়ক কে?
এ নিয়ে একমত নেই। কেউ নৈতিক মহত্ত্বের কারণে হোসেনকে, কেউ কাহিনির চালিকাশক্তি হিসেবে এজিদকে কেন্দ্রীয় চরিত্র মনে করেন, আর কেউ একক নায়ক নেই বলেন।
বিষাদ সিন্ধু কি পুরোপুরি ঐতিহাসিক গ্রন্থ?
না, এটি সাহিত্যকর্ম। এতে কারবালার ঐতিহাসিক পটভূমি আছে, কিন্তু লেখকের কল্পনায় যোগ করা অনেক ঘটনা ও চরিত্রচিত্রণও রয়েছে।