দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও চরিত্র বিশ্লেষণ
পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দেখলেন, লেখা আছে "দ্বিতীয় দিনের কাহিনী" উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। অনেকে তখন কাহিনির সারাংশ লিখতে শুরু করে দেন, তিন পাতা পেরিয়ে গেলেও প্রশ্নের উত্তর আর আসে না। উপন্যাসটা ছোট, পড়তে বসলে এক বসাতেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ছোট বই মানেই সহজ বই নয়। এই লেখায় সেই গোলমালগুলো পরিষ্কার করার চেষ্টা থাকল।
লেখককে একটু চিনে নিই
সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রামে, মৃত্যু ২০১৬ সালে। একজন মানুষ কবিতা লিখছেন, গল্প লিখছেন, উপন্যাস লিখছেন, নাটক লিখছেন, আবার চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও লিখছেন, এমন উদাহরণ আমাদের সাহিত্যে বেশি নেই। কাব্যনাট্যে তাঁর আলাদা পরিচিতি, সেটা অনেকেরই জানা। কিন্তু পরীক্ষার খাতায় "কবি ও নাট্যকার" লিখে থেমে গেলে অসম্পূর্ণ থাকে, কারণ এই উপন্যাস তাঁর গদ্যলেখক পরিচয়ের অংশ।
একটা জিনিস লক্ষ করার মতো। তাঁর লেখায় যুদ্ধ আসে, কিন্তু যুদ্ধের মাঠ ততটা আসে না। বেশি আসে যুদ্ধের পরের ঘর, রাস্তা, মানুষের মুখ। দ্বিতীয় দিনের কাহিনী সেই ধারারই লেখা।
নামটা নিয়ে আগে ভাবুন
নামকরণের প্রশ্ন প্রায় নিশ্চিতভাবে আসে, তাই উপন্যাসের ভেতরে ঢোকার আগে নামটা নিয়েই বসা ভালো। "দ্বিতীয় দিন" বলতে এখানে ক্যালেন্ডারের দ্বিতীয় তারিখ বোঝানো হয়নি। প্রথম দিনটা ধরুন যুদ্ধের দিন, যেদিন শত্রু স্পষ্ট ছিল, লড়াইয়ের কারণ স্পষ্ট ছিল। দ্বিতীয় দিনটা তার পরের দিন। শত্রু চলে গেছে, কিন্তু ভয় যায়নি। মানুষ আনন্দ করবে ভেবেছিল, অথচ দেখছে একে অন্যকে সন্দেহ করছে।
তাহলে নামের সার্থকতা কোথায়? এখানে যে, বিজয় একদিনে শেষ হয়ে যায় না, আর তার পরের দিনের লড়াইটা অনেক বেশি নিঃশব্দ, অনেক বেশি একা। উত্তরে এই দুই দিনের তফাতটা পরিষ্কার লিখতে পারলে অর্ধেক কাজ হয়ে যায়। বাকি অর্ধেক হলো উপন্যাসের ঘটনা থেকে একটা-দুটো উদাহরণ দেওয়া।
গল্পটা কোন দিকে যায়
তাহির একজন শিক্ষিত মানুষ। যুদ্ধের সময় সে এমন কিছু হারিয়েছে বা দেখেছে, যার ভার সে বইতে পারছে না। তাই বড় শহর ছেড়ে সে চলে আসে জলেশ্বরী নামের এক মফস্বল শহরে। জায়গাটা লেখকের কল্পনার, মানচিত্রে খুঁজে লাভ নেই। সেখানকার একটি স্কুলে সে প্রধান শিক্ষকের কাজ নেয়। ভেবেছিল, ক্লাসঘর আর খাতা দেখার নিয়মিত জীবনে কিছুটা শান্তি মিলবে।
মেলে না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জলেশ্বরীতেও নতুন ক্ষমতার হিসাব বসে গেছে। কে কার কথা শুনবে, কার হাতে কতটা জোর, এ নিয়ে টানাটানি চলছে। এই পরিবেশে ক্যাপ্টেন নামের এক মুক্তিযোদ্ধা নিজের মতো করে শাসন চালায়। তার কাছে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, আর সে নিজেই ঠিক করে কে দোষী, কে নির্দোষ।
তাহির এসবের মধ্যে ঠিক পক্ষও নেয় না, আবার পুরোপুরি দূরেও থাকতে পারে না। তার ভেতরের অস্থিরতা আর বাইরের চাপ একসঙ্গে বাড়তে থাকে, আর উপন্যাসের শেষ দিকে ঘটনা যে মোড় নেয়, তাতে পাঠকের অস্বস্তি হয়। শেষ অংশের খুঁটিনাটি, কে কী করল, কোন ক্রমে, পাঠ্যবই বা আপনার সংস্করণ খুলে মিলিয়ে লেখাই নিরাপদ। স্মৃতি থেকে লিখতে গিয়ে ঘটনার ক্রম উল্টে ফেলার ভুল খুব চেনা।
তাহির আর ক্যাপ্টেন, দুজন দুই মেরুর মানুষ
চরিত্র বিশ্লেষণের প্রশ্নে এই দুজনকে আলাদা আলাদা না লিখে পাশাপাশি রাখলে উত্তর অনেক জোরালো হয়। কেন, সেটা নিচে বলছি।
তাহির
তাহির কম কথা বলে। রাগ, কষ্ট, শোক, সবই সে ভেতরে চেপে রাখে। কিন্তু সে ভেঙে পড়া মানুষ নয়, কারণ সে স্কুলে যায়, ছাত্রদের সামনে দাঁড়ায়, একটা নিয়মে ফিরতে চায়। তার বাঁচার চেষ্টা আর তার ক্ষত, এই দুটো একসঙ্গে চলে। পরীক্ষায় "তাহির কি হতাশাবাদী চরিত্র?" ধরনের প্রশ্ন এলে এই দুই দিক দেখিয়ে লিখুন। শুধু হতাশা বললে অর্ধেক সত্য বলা হয়।
ক্যাপ্টেন
ক্যাপ্টেন এক কথায় খলনায়ক নয়। সে যুদ্ধ করেছে, এই পরিচয়টা তার কাছে সত্যি। সমস্যা হলো, যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরও সে ওই পরিচয়ের জোরেই মানুষের ওপর খবরদারি করে। বীরত্ব ক্ষমতায় বদলে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটাই লেখকের নজর কেড়েছে বলে মনে হয়। তাই ক্যাপ্টেনকে বিচার করতে গেলে "ভালো না মন্দ" দিয়ে শুরু না করে "যুদ্ধের পর সে কী হয়ে উঠল" দিয়ে শুরু করা ভালো।
| দিক | তাহির | ক্যাপ্টেন |
|---|---|---|
| স্বভাব | অন্তর্মুখী, চুপচাপ | সরব, আদেশ দিতে অভ্যস্ত |
| যুদ্ধের পর | ক্ষত বয়ে বেড়ায় | যুদ্ধের পরিচয়কে ক্ষমতা বানায় |
| সমাজে অবস্থান | শিক্ষক, শিক্ষার প্রতিনিধি | অস্ত্র ও ভয়ের প্রতিনিধি |
জলেশ্বরী: একটা শহর, অনেকগুলো দেশ
কল্পিত শহর বলে জলেশ্বরীকে হালকাভাবে নেওয়ার কারণ নেই। লেখক ইচ্ছে করেই একটা ছোট জায়গা বেছেছেন, যাতে পুরো দেশের ছবিটা ছোট মাপে দেখা যায়। এখানে সবাই সবাইকে চেনে, তাই অবিশ্বাসটা আরও তীব্র। বড় শহরে মানুষ নিজের ভয় লুকিয়ে রাখতে পারে, মফস্বলে পারে না।
যুদ্ধের পরের অনিশ্চয়তা, ক্ষমতার ভাগাভাগি, প্রতিশোধের মানসিকতা, এসব এই শহরেই জমাট বাঁধে। লিখতে গিয়ে "জলেশ্বরী সমগ্র সমাজের প্রতিচ্ছবি" বাক্যটা ব্যবহার করতে পারেন, তবে সঙ্গে একটা উদাহরণ জুড়ে দিন। শুধু বাক্য লিখলে পরীক্ষক সেটাকে মুখস্থ ধরে নেন।
আরেকটা কথা। উপন্যাসের সমাপ্তিতে স্কুলের সঙ্গে যে ঘটনা জড়ানো, সেটাকে অনেকে শিক্ষা বা আলোর ওপর আঘাত হিসেবে পড়েন। এটা একটা ব্যাখ্যা, এবং যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা। উত্তরে "অনেকে মনে করেন" ঢঙে না লিখে নিজের যুক্তি দিয়ে লিখুন, কেন স্কুল, কেন শিক্ষক।
যুদ্ধের পরের মানুষ: উপন্যাস আসলে কী নিয়ে
একটা প্রশ্ন ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই করে: এই বইয়ের মূল কথা এক লাইনে কী? এক লাইনে বলা কঠিন, কারণ বইটা একটা ঘটনা নিয়ে নয়, একটা অবস্থা নিয়ে। সেই অবস্থাকে ভেঙে দেখলে কয়েকটা সুতো পাওয়া যায়।
- ভেতরের ক্ষত। গুলির শব্দ থেমে গেলেও তাহিরের মাথার ভেতরের শব্দ থামে না। তার শহর বদলানো আসলে পালানোর চেষ্টা, আর সেই চেষ্টা যে কাজ করে না, সেটাই তার ট্র্যাজেডি।
- অবিশ্বাস। জলেশ্বরীতে একজন আরেকজনের দিকে তাকায় হিসাব কষে। কে কোন পক্ষে ছিল, কে কী লুকোচ্ছে, এই প্রশ্ন বাতাসে ভাসে।
- ক্ষমতার ভাগ। আইন তখনো দাঁড়ায়নি, তাই যার হাতে জোর, সেই সিদ্ধান্ত নেয়।
- স্বপ্ন আর বাস্তবের দূরত্ব। যে দেশের জন্য এত কিছু, সেই দেশ হাতে পেয়েও মানুষ কেন খুশি নয়, বইটা সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নের কাছে যায়।
পরীক্ষায় চারটাই লিখতে যাবেন না। যে প্রশ্ন এসেছে, তার সঙ্গে সবচেয়ে মেলে এমন একটা বা দুটো সুতো বেছে নিয়ে গভীরে যান। চারটা ছুঁয়ে গেলে কোনোটাই দাঁড়ায় না।
ভাষা, আর বলার ধরন
বইটা পড়তে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ে, লেখক গলা চড়াননি। শোকের কথা বলছেন, অথচ বিলাপ নেই। সহিংসতার আভাস আছে, অথচ বর্ণনায় উত্তেজনা নেই। বাক্যগুলো অনেক সময় ছোট, কখনো একটু থেমে থেমে এগোয়। এতে একটা চাপা, থমথমে ভাব তৈরি হয়, যা বিষয়ের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
সংলাপও খুব বেশি নেই। যা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি আছে চুপ করে থাকা, এড়িয়ে যাওয়া, মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। প্রথমবার পড়লে মনে হতে পারে, কিছুই তো ঘটছে না। দ্বিতীয়বার পড়লে বোঝা যায়, ঘটছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে। সময় থাকলে একবার অন্তত দ্বিতীয়বার পড়ুন, অন্তত প্রথম আর শেষ কয়েক অধ্যায়।
পড়তে গিয়ে যেখানে আটকে যান
অনেকে বলে, বইটা বোঝা যাচ্ছে না, ঘটনা এত কম কেন। এই অনুভূতিটা স্বাভাবিক। আমরা গল্প মানে বুঝি ঘটনার পর ঘটনা, আর এখানে লেখক বেশির ভাগ সময় মানুষের মনের ভেতরে থাকেন। তাই প্রতিটা অধ্যায় শেষ করে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, তাহিরের মনের অবস্থা আগের চেয়ে কতটা বদলাল। এভাবে পড়লে কম ঘটনার বইও গতিময় লাগে।
আরেকটা বিভ্রান্তি আসে চরিত্র আর ক্ষমতাধর মানুষদের নাম মনে রাখা নিয়ে। নাম মুখস্থের চেয়ে ভূমিকা মনে রাখা সহজ: কে শিক্ষক, কে অস্ত্রের জোরে চলে, কে স্থানীয় প্রভাব ধরে রাখতে চায়। নাম ভুল লিখলে নম্বর কাটে, কিন্তু ভূমিকা ভুল লিখলে পুরো উত্তরই ভুল পথে যায়, তাই ভূমিকাটাই আগে।
আর একটা ছোট অভ্যাস কাজে দেয়। পড়ার সময় খাতার এক পাশে তিনটা শিরোনাম রাখুন: তাহিরের ভেতর, জলেশ্বরীর বাইরে, আর স্কুল। যেখানে যে অংশ পড়লেন, সেখানে দু-এক শব্দে টুকে রাখুন। পরীক্ষার আগে এই তিন কলামই আপনার নিজের তৈরি নোট হয়ে যাবে, যা অন্যের লেখা সারাংশের চেয়ে মাথায় বেশি থাকে।
পরীক্ষার খাতায় যেভাবে সাজাবেন
এই উপন্যাস থেকে কী ধরনের প্রশ্ন আসে, সেটা আগে থেকে আন্দাজ করা যায়। কয়েকটা ধরন আর সেগুলোর জন্য কী করণীয়, নিচে ছকে দিলাম।
| প্রশ্নের ধরন | উত্তরের কেন্দ্র |
|---|---|
| নামকরণের সার্থকতা | প্রথম দিন বনাম দ্বিতীয় দিন, বিজয়ের পরের বাস্তবতা |
| চরিত্র বিশ্লেষণ | তাহির ও ক্যাপ্টেনের তুলনা, ঘটনা থেকে এক-দুটো উদাহরণ |
| সমাজচিত্র | জলেশ্বরীর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস, ভয় |
| লেখক পরিচিতি | জন্ম-মৃত্যুসাল, জন্মস্থান, লেখার ক্ষেত্রগুলো |
এবার কিছু বাস্তব পরামর্শ। প্রথমত, সারাংশ লিখতে বসে ঘটনার তালিকা বানাবেন না। প্রশ্ন যা চায়, তার সঙ্গে ঘটনা জুড়ে দিন। নামকরণে ঘটনা লাগে যুক্তির সমর্থনে, গল্প বলার জন্য নয়।
দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার আগের রাতে নতুন করে অনলাইনে ঘুরে ঘুরে সারাংশ পড়বেন না। কয়েকটা লেখায় চরিত্রের নাম বা ঘটনার ক্রম ভুল পাওয়া যায়, আর সেই ভুল মাথায় বসে গেলে খাতাতেও চলে আসে। নিজের পাঠ্যবই বা যে সংস্করণ পড়েছেন, সেটাই শেষ ভরসা।
তৃতীয়ত, উত্তরের শুরুতে একটা পরিষ্কার দাবি রাখুন, যেমন "এই উপন্যাসে যুদ্ধজয়ের পরের মানুষের একাকিত্ব ও অবিশ্বাস প্রধান হয়ে উঠেছে", তারপর সেটা প্রমাণ করুন। দাবি ছাড়া উত্তর অনেকটা ঠিকানা না লিখে চিঠি পাঠানোর মতো।
শেষ কথা
দ্বিতীয় দিনের কাহিনী পড়া শেষ করে মনে হয়, বইটা কোনো সমাধান দিতে চায়নি। সে শুধু দেখিয়েছে, যুদ্ধ জেতার পরের সকালটা কেমন হতে পারে। সেই সকালে তাহির আছে, ক্যাপ্টেন আছে, জলেশ্বরীর থমথমে পথঘাট আছে। পরীক্ষার জন্য পড়ুন, নম্বর তো পাবেনই। তবে যদি একবার ধীরে, কোনো প্রশ্নের তাড়া ছাড়া পড়েন, বইটা আপনাকে অন্য কিছুও দেবে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসের লেখক কে?
উপন্যাসটির লেখক সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫–২০১৬)। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে পরিচিত।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কে?
তাহির কেন্দ্রীয় চরিত্র। যুদ্ধের আঘাতে বিধ্বস্ত এই মানুষটি জলেশ্বরীর একটি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেয়।
উপন্যাসের পটভূমি কোথায়?
কাহিনির বড় অংশ ঘটে জলেশ্বরী নামের এক কল্পিত মফস্বল শহরে। সময়কাল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় দিনের কাহিনী নামের তাৎপর্য কী?
যুদ্ধের প্রথম দিনে ছিল প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ। দ্বিতীয় দিনে ফুটে ওঠে বিজয়ের পরের অবিশ্বাস, ক্ষত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। নামটি সেই বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে।
উপন্যাসের মূল বিষয় কী?
মূল বিষয় যুদ্ধোত্তর মানসিক আঘাত, সমাজে অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আদর্শ ও বাস্তবের ফারাক। শিক্ষার সংকটও এর একটি বড় দিক।