গোরা উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র ও মূল ভাবনা

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ · বাংলা সাহিত্য

সংক্ষেপেগোরা উপন্যাসের পটভূমি, কাহিনি, চরিত্র আর মূল ভাবনা সহজ ভাষায় গুছিয়ে বলা হয়েছে, সঙ্গে পরীক্ষার জন্য কাজের কিছু পরামর্শও আছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরা বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে এমন একটি বই, যা একসঙ্গে গল্প, তর্ক আর আত্মসন্ধানের দলিল। বইটির বিষয়বস্তু বুঝতে চাইলে শুধু ঘটনার ক্রম মনে রাখা যথেষ্ট নয়; জানতে হবে ঘটনার আড়ালে লেখক কোন প্রশ্নগুলো তুলেছেন। এই লেখায় উপন্যাসের পটভূমি, কাহিনির সারকথা, প্রধান চরিত্র, মূল ভাবনা আর পরীক্ষার প্রস্তুতির কিছু দিক সহজ ভাষায় গুছিয়ে বলা হলো।

উপন্যাসের পরিচিতি ও পটভূমি

গোরা প্রথমে প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯১০ সালে গ্রন্থাকারে বের হয়। আকারে এটি রবীন্দ্রনাথের বৃহত্তম উপন্যাসগুলোর একটি। বাংলা সাহিত্যে একে প্রায়ই মহাকাব্যিক বিস্তারের উপন্যাস বলা হয়, কারণ এখানে ব্যক্তির জীবনের পাশাপাশি পুরো একটি সমাজের টানাপোড়েন উঠে এসেছে।

কাহিনির সময় ঔপনিবেশিক ভারত। তখন শিক্ষিত বাঙালি সমাজ কয়েকটি ধারায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল। একদিকে ছিল প্রাচীন হিন্দু আচার ও জাত্যভিমানকে আঁকড়ে ধরা রক্ষণশীল মানুষ, অন্যদিকে ব্রাহ্মসমাজের যুক্তিবাদী ও সংস্কারপন্থী অংশ। এই দুই শিবিরের সংঘাত আর তার মাঝখানে দাঁড়ানো কয়েকজন তরুণ-তরুণীর জীবনই উপন্যাসের কেন্দ্র।

কাহিনির সারসংক্ষেপ

গোরা কলকাতার এক শিক্ষিত, তেজস্বী যুবক। সে নিজেকে গোঁড়া হিন্দু বলে পরিচয় দেয়, শাস্ত্রীয় আচার মানে এবং ব্রাহ্ম ও খ্রিষ্টানদের তীব্র সমালোচনা করে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিনয় অনেক বেশি নরম স্বভাবের, মুক্তচিন্তার মানুষ। বিনয়ের যাতায়াত শুরু হয় ব্রাহ্ম পরিবার পরেশবাবুর বাড়িতে, যেখানে সুচরিতা ও ললিতার মতো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন তরুণীরা আছেন।

গোরা প্রথমে এই মেলামেশায় অসন্তুষ্ট হয়। তবু ঘটনাচক্রে সে নিজেও সুচরিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। বিনয় আর ললিতার সম্পর্ক এগোতে থাকে। পরিবার ও সমাজের চাপ, ধর্মীয় বিধিনিষেধ আর ব্যক্তিগত অনুভূতি এই সম্পর্কগুলোকে বারবার পরীক্ষায় ফেলে।

গোরা একসময় গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের দুঃখদুর্দশা সরাসরি দেখে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সে কারাবরণও করে। এই অভিজ্ঞতা তার ভেতরের বিশ্বাসে প্রথম বড় ফাটল ধরায়। উপন্যাসের চূড়ান্ত বাঁক আসে তখন, যখন তার পালক-পিতা কৃষ্ণদয়াল জন্মের আসল সত্য প্রকাশ করেন: গোরা জন্মসূত্রে হিন্দু ব্রাহ্মণসন্তান নয়, সে এক আইরিশ দম্পতির সন্তান, যাঁদের মৃত্যু হয়েছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময়।

সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষাপট

উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত বাংলার শিক্ষিত সমাজ নিজের অবস্থান নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিল। পশ্চিমি শিক্ষা এসেছে, নতুন চিন্তা এসেছে, আবার বিদেশি শাসনের অপমানও প্রতিদিনের বাস্তব। এই অবস্থায় কেউ ঐতিহ্যের দিকে ফিরে যেতে চেয়েছেন, কেউ সংস্কারের পথ বেছেছেন। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসে এই দুই প্রবণতার কোনোটিকেই সরলভাবে খারিজ করেননি; বরং দেখিয়েছেন, দুই পক্ষেই যেমন সততা আছে, তেমনি সংকীর্ণতার ঝুঁকিও আছে।

ব্রাহ্মসমাজের চরিত্রদের মধ্যেও তাই সবাই আদর্শ নন। কেউ কেউ নিজের মতের কড়াকড়িতে আরেক ধরনের গোঁড়ামিতে আটকে যান। এতে বোঝা যায়, লেখকের আপত্তি কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে নয়, আপত্তি মানুষকে ছোট করে দেখা মনোভাবের বিরুদ্ধে।

প্রধান চরিত্র

মূল ভাবনা ও বিষয়বস্তু

উপন্যাসের নামটিও লক্ষ করার মতো। গোরা শব্দের অর্থ ফর্সা, আর নায়কের গায়ের রং ও চেহারা তার পারিপার্শ্বিক মানুষদের থেকে আলাদা। এই বাহ্যিক পার্থক্য শেষ পর্যন্ত তার জন্মরহস্যের সঙ্গে অর্থবহভাবে মিলে যায়, যদিও লেখক দেখান যে চেহারার চেয়ে অনেক গভীরে মানুষের পরিচয় বাঁধা থাকে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো, মানুষের আসল পরিচয় কী। জন্ম, জাত বা ধর্মের ছাপ কি সেই পরিচয় ঠিক করে, নাকি মানুষের কাজ, বোধ ও ভালোবাসা? গোরার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখানেই। যে পরিচয় নিয়ে সে এতদিন গর্ব করেছে, তার ভিত্তিই সত্য নয় জেনে সে ভেঙে পড়ে না; বরং নতুন এক বিস্তৃত পরিচয় খুঁজে পায়।

এই ভাবনাকে কয়েকটি ভাগে সাজানো যায়:

পরীক্ষায় উত্তর লেখার সময় মনে রাখুন: গোরার পরিবর্তন কোনো আদর্শ ত্যাগ নয়, বরং সংকীর্ণ আদর্শ থেকে ব্যাপক মানবিক আদর্শে উত্তরণ।

গোরা চরিত্রের বিকাশ

উপন্যাসের শুরুতে গোরা এক ধরনের প্রতিরক্ষামূলক জাতীয়তাবাদী। বিদেশি শাসন ও মিশনারি প্রভাবের বিরুদ্ধে সে নিজের ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে, আর সেই আঁকড়ে ধরাটা ক্রমে আচারের দাসত্বে পরিণত হয়। প্রেম, বন্ধুত্ব ও গ্রামের অভিজ্ঞতা তাকে ধীরে ধীরে প্রশ্ন করতে শেখায়।

জন্মরহস্য জানার পর তার সামনে ধর্ম, জাত ও সমাজের সব সীমারেখা সরে যায়। সে বুঝতে পারে, যে ভারতকে সে ভালোবাসে তা কোনো এক শ্রেণির বা এক ধর্মের নয়। এই উপলব্ধিই তার চরিত্রের পূর্ণতা। অন্যদিকে আনন্দময়ীর কাছে সে ফিরে যায় এমন এক সন্তান হয়ে, যে মাকে আগের চেয়ে অনেক গভীরভাবে চেনে।

শিল্পগুণ ও সমালোচকদের দৃষ্টি

গোরা তত্ত্বপ্রধান উপন্যাস, তবু এটি নিছক বক্তৃতা নয়। সংলাপের ধার, চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আর সমাজের বিস্তৃত চিত্র একে প্রাণবন্ত করেছে। সমালোচকেরা এখানে তিনটি দিক বিশেষভাবে লক্ষ করেন:

  1. বিতর্ক ও সংলাপের মধ্য দিয়ে আদর্শের সংঘাত ফুটিয়ে তোলা।
  2. ব্যক্তিগত প্রেম ও সামাজিক প্রশ্নকে একই সুতোয় বাঁধা।
  3. নায়ককে নিছক আদর্শের মুখপাত্র না রেখে রক্তমাংসের মানুষ করে তোলা।

ভাষার দিক থেকেও উপন্যাসটি লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ এখানে সাধু গদ্যের পরিশীলিত সৌন্দর্য রেখেছেন, আবার সংলাপে চরিত্রের মেজাজ ধরেছেন। গোরার কথায় যে দৃঢ়তা, বিনয়ের কথায় যে কোমলতা, পরেশবাবুর কথায় যে প্রশান্তি, তা সংলাপ পড়লেই আলাদা করে চেনা যায়। প্রকৃতি ও পরিবেশের বর্ণনাও কাহিনির মনের অবস্থার সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলে।

পাঠকের জন্য আরেকটি সুবিধা হলো, বইটির বহু অংশ আলাদা করে পড়লেও নিজস্ব অর্থ ধরে রাখে। তাই সময় কম থাকলে গোরা ও আনন্দময়ীর, গোরা ও সুচরিতার এবং শেষ পর্বের দৃশ্যগুলো আগে পড়ে নিতে পারেন।

কেউ কেউ বলেন, উপন্যাসের কিছু অংশে তর্ক কাহিনিকে ধীর করে দেয়। তবু বাংলা উপন্যাসে ভাবনার গভীরতা আর পরিসরের দিক থেকে গোরার জায়গা প্রায় অনন্য।

পরীক্ষার জন্য কিছু পরামর্শ

প্রশ্নের ধরনযেদিকে জোর দেবেন
চরিত্র বিশ্লেষণগোরার বিশ্বাস, সংকট ও উত্তরণ
নামকরণনায়কের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ও আদর্শের প্রতীক
মূল ভাবনাজাতপাতের ঊর্ধ্বে মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতা
আনন্দময়ীসংস্কারমুক্ত মাতৃত্ব ও সার্বজনীন স্নেহ

পড়ার সময় একটি কৌশল কাজে লাগে: প্রতিটি প্রধান চরিত্রের পাশে লিখে রাখুন সে কোন ধারণার প্রতিনিধি এবং উপন্যাসের শেষে তার অবস্থান কতটা বদলেছে। এতে চরিত্রভিত্তিক প্রশ্ন সহজ হয়, আর নামকরণ বা মূল ভাবনার প্রশ্নেও যুক্তি সাজানো যায়।

আরেকটি বিষয় হলো সম্পর্কের জটিলতা। গোরা ও বিনয়ের বন্ধুত্ব, গোরা ও সুচরিতার আকর্ষণ, বিনয় ও ললিতার ঘনিষ্ঠতা এবং গোরা ও আনন্দময়ীর মা-ছেলের বন্ধন, এই চারটি সম্পর্ক পরপর সাজিয়ে লিখলে উপন্যাসের ব্যক্তিগত ও সামাজিক দুই স্তরই ধরা পড়ে। পরীক্ষার উত্তরে এই সংযোগ দেখাতে পারলে উত্তর অনেক বেশি পরিণত মনে হয়।

প্রশ্ন যেভাবেই আসুক, উত্তরে কাহিনির মূল মোড়, চরিত্রের ভূমিকা আর কেন্দ্রীয় ভাবনা, এই তিনটি দিক ছুঁয়ে গেলে উত্তর সম্পূর্ণ দেখায়। উদাহরণ বা ঘটনার উল্লেখ নিজের ভাষায় লিখুন, মুখস্থ বাক্য বসানোর দরকার নেই।

শেষ কথা

গোরা পড়া মানে শুধু একটি পুরোনো উপন্যাসের কাহিনি জানা নয়; এটি নিজের পরিচয়, বিশ্বাস আর সমাজের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে ভাবার আমন্ত্রণ। জাত বা ধর্মের সীমা পেরিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে বার্তা এই উপন্যাস দেয়, তা শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক। পাঠ্য হিসেবে পড়ুন বা পাঠক হিসেবে, মূল বই হাতে নিয়ে অন্তত কিছু অধ্যায় পড়ে দেখলে এই লেখার প্রতিটি কথা আরও স্পষ্ট হবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

q

a

q

a

q

a

q

a

q

a