কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস: কাহিনি, চরিত্র ও নামকরণ

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · বাংলা সাহিত্য

সংক্ষেপেবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের কাহিনি, গোবিন্দলাল-ভ্রমর-রোহিণীর ভূমিকা, বিষয়বস্তু, নামকরণ ও আখ্যানরীতি এখানে গুছিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

বাংলা উপন্যাসের আলোচনায় কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। জমিদারবাড়ির সম্পত্তি, একটি উইল আর তাকে ঘিরে ঘনিয়ে ওঠা লোভ ও ভালোবাসার জটিলতা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এখানে এক সংসারের ভাঙনের ছবি এঁকেছেন। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আপনাকে কাহিনির ধারা, প্রধান চরিত্র, নামকরণ আর উপন্যাসের শিল্পরীতি বুঝে নিতে হবে। এই লেখায় সেগুলোই পরপর সাজিয়ে দেওয়া হলো।

উপন্যাসটির পরিচয়

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) বাংলা সাহিত্যে আধুনিক উপন্যাসের পথ খুলে দেওয়া লেখকদের অগ্রণী। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসের পাশাপাশি আছে একগুচ্ছ সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস, যার মধ্যে বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল বিশেষভাবে আলোচিত। কৃষ্ণকান্তের উইল প্রথমে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানা যায়, পরে ১৮৭৮ সালে এটি গ্রন্থাকারে বের হয়।

এই উপন্যাসের পরিসর ছোট, ঘটনা দ্রুত এগোয়, আর কাহিনি মূলত একটি জমিদার পরিবারের ভেতরেই ঘোরাফেরা করে। ইতিহাসের বিশাল পটভূমি এখানে নেই। বদলে আছে ঘরের ভেতরের মানুষের মনের টানাপোড়েন, আর সেটাই উপন্যাসটিকে আজও পাঠযোগ্য রেখেছে।

কাহিনির সারমর্ম

হরিদ্রাগ্রামের প্রবীণ জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায় তাঁর বিপুল সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে একটি উইল তৈরি করেন। তাঁর দুই ছেলে হরলাল ও বিনোদলাল, ভ্রাতুষ্পুত্র গোবিন্দলাল, স্ত্রী ও কন্যা, সবাই এই সম্পত্তির দাবিদার। উইলে ভাতিজা গোবিন্দলালের প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ ফুটে ওঠায় বড় ছেলে হরলাল ক্ষুব্ধ হন। তিনি জাল উইল বানিয়ে আসল উইলটি সরিয়ে ফেলার ফন্দি আঁটেন।

এই কাজে তিনি ব্যবহার করেন রোহিণীকে, যে এক রূপবতী বাল্যবিধবা। হরলাল তাকে বিয়ের আশ্বাস দেন বলে কাহিনিতে ইঙ্গিত আছে, কিন্তু কথা রাখেন না। এ ঘটনার পর রোহিণীর মন ঘুরে যায়, আর ধীরে ধীরে সে গোবিন্দলালের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অন্যদিকে গোবিন্দলালের স্ত্রী ভ্রমর স্বামীকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন, কিন্তু সংসারের চোখে সরল ও কিছুটা অভিমানী।

গোবিন্দলালের মনে রোহিণীর জন্য মমতা থেকে মোহ জন্মায়। এই সম্পর্কের খবর ছড়িয়ে পড়লে ভ্রমরের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ে। কৃষ্ণকান্ত শেষ পর্যন্ত নিজের উইল বদলে ফেলেন, ফলে ভ্রমরের সঙ্গে স্বামীর সম্পর্কের টানাপোড়েন সম্পত্তির প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়। গোবিন্দলাল গৃহত্যাগ করেন, রোহিণীকে নিয়ে আলাদা জীবন শুরু করেন, কিন্তু সে জীবন তাঁকে শান্তি দেয় না। পরিণতিতে রোহিণীর মৃত্যু ঘটে, ভ্রমরও প্রাণ হারান, আর গোবিন্দলালের জীবন শূন্যতায় শেষ হয়।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ উইলকে কেন্দ্র করে দুবার বাঁক নেয়। প্রথম বাঁকে রোহিণী ঢুকে পড়ে জমিদার পরিবারের ভেতরে, দ্বিতীয় বাঁকে ভেঙে যায় গোবিন্দলাল-ভ্রমরের দাম্পত্য।

প্রধান চরিত্র

উপন্যাসে চরিত্রের সংখ্যা বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি চরিত্র ঘটনার একটি নির্দিষ্ট সুতো টানে।

চরিত্রভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য
কৃষ্ণকান্ত রায়প্রবীণ জমিদার; তাঁর উইলই কাহিনির কেন্দ্র, বিচক্ষণ হয়েও পরিবারের ভাঙন ঠেকাতে পারেননি
গোবিন্দলালকৃষ্ণকান্তের ভাতিজা; সুদর্শন, শৌখিন ও সৎ মানুষ, কিন্তু মোহের কাছে হার মেনে নিজের পতন ডেকে আনেন
ভ্রমরগোবিন্দলালের স্ত্রী; গভীর প্রেম, আত্মমর্যাদা ও সরলতার প্রতীক
রোহিণীরূপসী বিধবা; বুদ্ধিমতী, আবেগপ্রবণ, সমাজের কঠিন নিয়মে রুদ্ধ এক নারী
হরলালকৃষ্ণকান্তের বড় ছেলে; স্বার্থপর ও চতুর, জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পত্তি হাতানোর চেষ্টা করে

এছাড়া পরিবারের অন্য সদস্য ও পরিচিতরাও কাহিনিতে এসেছেন, তবে পরীক্ষায় সাধারণত উপরের পাঁচজনের ভূমিকাই বেশি প্রাসঙ্গিক। নামধাম ও সম্পর্কের খুঁটিনাটি লেখার আগে আপনার পাঠ্য সংস্করণ একবার মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

গোবিন্দলাল ও ভ্রমরের দ্বন্দ্ব

গোবিন্দলাল দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ নন, এ কথাটাই উপন্যাসের ট্র্যাজেডিকে ভারী করে। ভোগের দিকে ঝোঁক আর আত্মসংযমের অভাব তাঁকে ধাপে ধাপে নীচে নামায়। ভ্রমর অন্যদিকে ভালোবাসায় অটল, আবার অভিমানেও দৃঢ়। দুজনের এই বিপরীত স্বভাবই কাহিনিকে নাটকীয় মোড় দেয়।

রোহিণীকে কীভাবে দেখবেন

রোহিণীকে শুধু খলনায়িকা বলে সরিয়ে দিলে ভুল হবে। সমাজ তাকে বিধবা হিসেবে সব সুখ থেকে বঞ্চিত করেছে, অথচ তার মনে আছে আকাঙ্ক্ষা ও জীবনের তৃষ্ণা। সমালোচকদের কেউ কেউ তাই তাকে সহানুভূতির চোখে দেখেন, আবার কেউ লেখকের নৈতিক বিচারের কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিষয়বস্তু ও মূল ভাবনা

উপন্যাসের ভাবনাগুলো কয়েকটি ভাগে ধরা যায়।

বঙ্কিমের নীতিবোধ এখানে কাজ করেছে সক্রিয়ভাবে। তিনি অনৈতিক আচরণের ফল দেখিয়েছেন নির্মম পরিণতির মধ্য দিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সময়ের পাঠকের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও আজকের পাঠক প্রায়ই এ নিয়ে বিতর্ক করেন।

নামকরণের সার্থকতা

উপন্যাসের নাম কৃষ্ণকান্তের উইল। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, নামটি কেবল একটি আইনি দলিলের কথা বলছে। কিন্তু কাহিনির গতি লক্ষ করলে বোঝা যায়, এই দলিলই সব ঘটনার সূচনা ও বাঁক নির্ধারণ করেছে। উইল নিয়ে হরলালের ষড়যন্ত্র রোহিণীকে জমিদারবাড়ির ভেতরে টেনে আনে, আর উইল বদলের পর সম্পত্তি ও দাম্পত্যের টানাপোড়েন চরম রূপ নেয়।

তবে অনেক সমালোচক মনে করেন, এই নামকরণ পুরোপুরি সর্বজনগ্রাহ্য নয়। কারণ উপন্যাসের মূল আবেদন সম্পত্তির বিবাদে নয়, গোবিন্দলাল, ভ্রমর ও রোহিণীর মানসিক সংঘাতে। সেই দিক থেকে নামটি ঘটনার কাঠামোকে ধরে, হৃদয়ের নাটককে নয়। তবু বলা যায়, উইল এখানে শুধু বিষয়সম্পত্তির প্রতীক নয়, সে এমন এক সূত্র, যা একটি পরিবারের নৈতিক পতনের গোড়ায় রয়েছে। এই বিবেচনায় নামকরণকে সার্থক বলা চলে, আর পরীক্ষায় দুই দিকের যুক্তিই তুলে ধরলে উত্তর সমৃদ্ধ হয়।

আখ্যানকৌশল ও ভাষারীতি

বঙ্কিম এখানে সর্বজ্ঞ কথকের ভূমিকায় থেকে কাহিনি বলেছেন। প্রয়োজন হলে তিনি নিজেই চরিত্রের কাজের মূল্যায়ন করেন, পাঠককে মন্তব্যের মাধ্যমে ভাবতে বাধ্য করেন। এর সঙ্গে আছে মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, বিশেষ করে গোবিন্দলালের মনের ধাপে ধাপে বদলে যাওয়া দেখানোর ক্ষেত্রে।

কাহিনি আঁটসাঁট, অপ্রয়োজনীয় শাখা-ঘটনা কম, আর কৌতূহল ধরে রাখার জন্য উইল বদলের মতো নাটকীয় মোড় ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকৃতির বর্ণনা, বিশেষ করে বাগান ও জলাশয়ের ছবি, চরিত্রদের মনের অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে আনা হয়েছে। ভাষা সংস্কৃতঘেঁষা সাধু বাংলা, কিন্তু সংলাপে মাঝে মাঝে সহজ ও প্রাণবন্ত সুর শোনা যায়। চরিত্রদের মুখোমুখি দৃশ্যগুলো নাট্যগুণে উজ্জ্বল।

সমালোচনায় উপন্যাসটির স্থান

সমালোচকদের অনেকে একে বঙ্কিমের সামাজিক উপন্যাসের পরিণত রূপ বলে মনে করেন, কারণ এখানে ঘটনার চেয়ে মানুষের অন্তর্জগৎ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কাহিনির ট্র্যাজেডি, চরিত্রগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ও শিল্পের সংযম প্রশংসিত হয়েছে। অন্যদিকে লেখকের নৈতিক সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে রোহিণীর পরিণতি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। কেউ কেউ পরবর্তী কালের বিধবা-চরিত্রপ্রধান উপন্যাসের সঙ্গে, যেমন রবীন্দ্রনাথের চোখের বালির সঙ্গে, তুলনা করে দেখান যে নারীর আত্মপ্রকাশের চিত্রায়ণ কীভাবে বদলেছে। এই তুলনায় যাওয়ার আগে নিজের পাঠ্যক্রম ও শিক্ষকের নির্দেশ দেখে নিন।

পরীক্ষায় কীভাবে উত্তর সাজাবেন

এই উপন্যাস থেকে সাধারণত কয়েক ধরনের প্রশ্ন আসে। কাহিনি-সংক্ষেপ লিখতে বললে ঘটনাক্রম মাথায় রেখে উইল, রোহিণীর প্রবেশ, গোবিন্দলালের গৃহত্যাগ ও পরিণতির ক্রমটি বজায় রাখুন। চরিত্র-বিশ্লেষণে কোনো একজনের গুণ ও দুর্বলতা দুটোই দেখান, কারণ বঙ্কিম কাউকে সম্পূর্ণ ভালো বা সম্পূর্ণ মন্দ করে আঁকেননি। নামকরণের প্রশ্নে নিজের একটি অবস্থান নিন এবং কাহিনি থেকে যুক্তি দিয়ে তা প্রমাণ করুন।

শেষ কথা

কৃষ্ণকান্তের উইল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি, যেখানে সম্পত্তির লোভ ও রূপের মোহ মিলে একটি সংসারের পতন ঘটায়। কাহিনির সারাংশ, কৃষ্ণকান্ত-গোবিন্দলাল-ভ্রমর-রোহিণী-হরলালের ভূমিকা, বিষয়বস্তু, নামকরণের পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তি এবং বঙ্কিমের আখ্যানরীতি, এই পাঁচটি অংশ গুছিয়ে পড়লে পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো হবে। উত্তর লেখার সময় নিজের নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের তথ্যকে অগ্রাধিকার দিন।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের লেখক কে?

উপন্যাসটির লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এটি তাঁর সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম।

কৃষ্ণকান্তের উইল কবে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়?

উপন্যাসটি ১৮৭৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তার আগে এটি বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল বলে জানা যায়।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কারা?

প্রধান চরিত্র কৃষ্ণকান্ত, গোবিন্দলাল, ভ্রমর, রোহিণী ও হরলাল। এদের সম্পর্ক ও সংঘাতকে ঘিরেই কাহিনি এগিয়েছে।

কৃষ্ণকান্তের উইল নামকরণ কি সার্থক?

উইলকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূচনা ও মোড় বদল ঘটে, তাই নামটি কাহিনির কাঠামোর দিক থেকে সার্থক। তবে কেউ কেউ বলেন, উপন্যাসের আসল জোর মানসিক সংঘাতে, তাই নামটি পুরোপুরি সবটুকু ধরে না।

উপন্যাসের মূল বিষয় কী?

মূল বিষয় রূপমোহ, দাম্পত্য আস্থার ভাঙন, সম্পত্তির লোভ এবং নীতিলঙ্ঘনের পরিণতি। বিধবা নারীর সামাজিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ।