নবান্ন নাটক: পটভূমি, কাহিনি ও নামকরণের সার্থকতা
বাংলা নাটকের ইতিহাসে নবান্ন নাটক এমন একটি নাম, যাকে বাদ দিয়ে আধুনিক গণমুখী থিয়েটারের কথা বলাই যায় না। রাজা-রানি বা দেবদেবীর গল্প নয়, বরং ক্ষুধার্ত চাষির জীবন মঞ্চে তুলে এনেছিলেন নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। সাহিত্যের শিক্ষার্থী হিসেবে আপনাকে নাটকটির লেখক, সময়ের প্রেক্ষাপট, কাহিনি, চরিত্র, নামকরণ আর নাট্যশৈলী সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। এই লেখায় সেই বিষয়গুলো ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো।
নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য
বিজন ভট্টাচার্য (১৯১৭–১৯৭৮) বিংশ শতকের বাংলা নাট্যজগতের একজন যুগপ্রবর্তক ব্যক্তিত্ব। তিনি একই সঙ্গে নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক ছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই বামপন্থী চিন্তার সঙ্গে তাঁর যোগ গড়ে ওঠে এবং সেই চিন্তাই তাঁর লেখার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায়। সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন তাঁর স্ত্রী।
নবান্নের আগে তিনি আগুন ও জবানবন্দী নামে দুটি একাঙ্ক নাটক লিখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর কলমে এসেছে মরাচাঁদ, গোত্রান্তর, দেবীগর্জন, জতুগৃহের মতো নাটক। তবে পাঠকমহলে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি নবান্নই। মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে শুধু সহানুভূতির চোখে নয়, সামাজিক অন্যায়ের ফল হিসেবে দেখানোই ছিল তাঁর নাট্যভাবনার মূল সুর।
পটভূমি: মন্বন্তর ও গণনাট্য আন্দোলন
নাটকটি বুঝতে হলে আগে সময়টা বুঝতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ তখন বাংলার গ্রামেও এসে পড়েছে। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের উত্তাল আবহ, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, মজুতদারি আর কালোবাজারি মিলিয়ে বাংলায় নেমে আসে ১৩৫০ বঙ্গাব্দের (১৯৪৩ সালের) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের হিসাব এক নয়, তবে এটুকু নিশ্চিত যে বিপুল সংখ্যক মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিলেন। অনেকের মতে এটি শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মুনাফাখোরির ভূমিকাও এতে বড় ছিল।
এই সময়েই ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)। ১৯৪৩ সালে সংগঠনটি সর্বভারতীয় রূপ নেয়, আর বাংলায় এর প্রভাব ছিল গভীর। সংঘের লক্ষ্য ছিল নাটক, গান ও নাচের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কথা সাধারণ মানুষের কাছেই পৌঁছে দেওয়া। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন এই আন্দোলনের সামনের সারির কর্মী। মন্বন্তরের বাস্তব অভিজ্ঞতা আর গণনাট্যের আদর্শ, এই দুইয়ের মিলনেই জন্ম নেয় নবান্ন।
নাটকের কাহিনি
নাটকের কেন্দ্রে আছে প্রধান সমাদ্দার নামের এক প্রবীণ চাষি এবং তাঁর পরিবার। গ্রামে ফসল ফলানোই তাঁদের জীবন। কিন্তু মহাজনের শোষণ, অভাব আর প্রকৃতির রোষে তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমি বিপর্যস্ত হয়। ঋণের জালে জড়িয়ে চাষিরা ধীরে ধীরে জমি হারান, ক্ষুধা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। একসময় বাঁচার তাগিদে পরিবারটি গ্রাম ছেড়ে কলকাতার পথে পা বাড়ায়।
শহরে এসে তারা দেখে, এখানে দয়া বলে কিছু নেই। পথে-ফুটপাতে ভিড় করা অনাহারী মানুষের সঙ্গে তাদেরও খাবারের খোঁজে হাতড়ে বেড়াতে হয়। অনাহার, রোগ আর অবহেলায় পরিবারের সদস্যরা একে একে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। প্রধানের মতো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষকে ভিক্ষার পথে নামতে দেখা নাটকের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশগুলোর একটি।
শেষ অংশে সুর বদলায়। বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষগুলো গ্রামে ফিরে আসে এবং বুঝতে পারে, একা একা টিকে থাকা সম্ভব নয়। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিতভাবে চাষের সিদ্ধান্ত নেয়। নাটকের সমাপ্তি ঘটে নতুন ফসল তোলার উৎসব দিয়ে, যেখানে দুঃখের পাশাপাশি নতুন করে বাঁচার সাহসও উচ্চারিত হয়।
প্রধান চরিত্র
নবান্নের চরিত্ররা কোনো বীর বা অতিমানব নয়, তারা আমাদের চেনা গ্রামের মানুষ। এই সাধারণত্বই নাটকের শক্তি।
| চরিত্র | ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|
| প্রধান সমাদ্দার | নাটকের কেন্দ্রীয় চাষি; দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যে সর্বস্বান্ত হয়েও শেষে নতুন আশার অংশীদার |
| কুঞ্জ | প্রতিবাদী মনোভাবের তরুণ চাষি; অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নোয়াতে নারাজ |
| নিরঞ্জন | গ্রামের সংগঠক ধরনের চরিত্র; যৌথ চাষের ভাবনার সঙ্গে যুক্ত |
| রাধিকা | কুঞ্জের স্ত্রী; ক্ষুধা ও শোকে ভারাক্রান্ত নারীর প্রতিনিধি |
| বিনোদিনী | গ্রামের নারীদের যন্ত্রণা ও সহনশীলতার প্রতীক |
| হারু দত্ত | শোষক মহাজন; গ্রামীণ অর্থনৈতিক অত্যাচারের মুখ |
চরিত্রগুলোর পারিবারিক সম্পর্ক ও ঘটনার ধারাবাহিকতা নিয়ে নানা সংস্করণ ও আলোচনায় সামান্য ভিন্নতা চোখে পড়ে। তাই উত্তর লেখার আগে আপনার পাঠ্যবই বা নাটকের মূল পাঠ মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
নামকরণের সার্থকতা
নবান্ন শব্দের মানে নতুন অন্ন, অর্থাৎ নতুন ধান ঘরে তোলার পর যে প্রথম খাবার রান্না করা হয়। বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে অগ্রহায়ণ মাসে এই উৎসব পালিত হয়। ফসল তোলার আনন্দ, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে খাওয়া আর প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, সব মিলিয়ে নবান্ন সচ্ছলতা ও উৎসবের প্রতীক।
এখানেই নাটকের নামের বিশেষ তাৎপর্য। নাটকের বড় অংশ জুড়ে মানুষ খেতে পায় না, অথচ নামটি রাখা হয়েছে খাদ্যের উৎসবের নামে। এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। নামটি একদিকে মন্বন্তরের শূন্য থালার তীব্র বিপরীত ছবি তুলে ধরে, অন্যদিকে ইঙ্গিত দেয় যে ঐক্য ও পরিশ্রমের জোরে নতুন ফসল, নতুন জীবন সম্ভব। নাটকের সমাপ্তির উৎসব তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, নতুন সমাজ গড়ার সংকল্পের প্রতীকও। এসব কারণে অধিকাংশ সমালোচক নামকরণকে সার্থক বলে মনে করেন।
বিষয়বস্তু ও মূল বার্তা
নবান্নের আলোচ্য বিষয়গুলো একসঙ্গে সাজিয়ে দেখা যেতে পারে:
- ক্ষুধা ও দারিদ্র্য। মন্বন্তরের নির্মম বাস্তবতা নাটকের প্রতিটি দৃশ্যে ছায়া ফেলে।
- শোষণ। মহাজন, মজুতদার ও ক্ষমতাবানদের হাতে গ্রামের মানুষের অসহায়তা দেখানো হয়েছে।
- শহরের নির্লিপ্ততা। গ্রামের মানুষ ভেবেছিল শহরে আশ্রয় মিলবে, কিন্তু সেখানে মিলেছে অবহেলা।
- ঐক্য ও যৌথ প্রচেষ্টা। নাটকের শেষ বার্তা হলো, সংঘবদ্ধ হলেই মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বিপদের দিনে ধর্ম নয়, শ্রেণিগত অবস্থান ও মানবিক বন্ধনই বড় হয়ে ওঠে, এমন ভাবনা নাটকে লক্ষ করা যায়।
মোটকথা, নাট্যকার দুর্ভিক্ষকে শুধু দৈব দুর্বিপাক হিসেবে দেখাননি। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজব্যবস্থার ত্রুটি ও লোভ কীভাবে মানুষের দুঃখকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
নাট্যশৈলী ও বাংলা নাটকে স্থান
নাট্যকৌশলের দিক থেকে নবান্ন ছিল সেই সময়ের জন্য নতুন। এর বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা, গ্রামের মুখের ভাষার ব্যবহার, দলগত অভিনয় আর দৃশ্যের পর দৃশ্যে অনাড়ম্বর মঞ্চসজ্জা মিলে এক স্বতন্ত্র আবহ তৈরি করেছিল। নাটকে নায়ক-নায়িকা বলে আলাদা কেউ নেই, বরং পুরো গোষ্ঠীই যেন নায়ক। গান ও সমবেত কণ্ঠের ব্যবহারও আবেগকে তীব্র করেছে। অভিনয় ও নির্দেশনায় শম্ভু মিত্রের মতো শিল্পীদের যুক্ততা প্রযোজনাটিকে পেশাদার মান দিয়েছিল।
কেন নবান্ন গুরুত্বপূর্ণ
এই নাটকের সাফল্যের পর বাংলা থিয়েটারে গণনাট্য ও পরে গ্রুপ থিয়েটার ধারার পথ আরও প্রশস্ত হয়। সাধারণ মানুষের জীবনকে মঞ্চের মূল বিষয় করে তোলার যে ধারা এখান থেকে জোরালো হয়, তা পরবর্তী কয়েক দশকের নাট্যচর্চাকে প্রভাবিত করেছে। তবে এ কথা মনে রাখা দরকার যে, নবান্নের আগে বা সমসময়ে সাধারণ মানুষকে নিয়ে লেখা নাটকের উদাহরণ একেবারে ছিল না, এমন দাবি করা ঠিক নয়। সঠিক কথা হলো, নবান্ন এই ধারাকে সংগঠিত ও শক্তিশালী রূপে মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
শেষ কথা
নবান্ন নাটক একই সঙ্গে ইতিহাসের দলিল ও শিল্পের সফল প্রয়োগ। মন্বন্তরের বেদনা আর ঐক্যের আশা, এই দুই মেরুর মধ্যেই নাটকটি দাঁড়িয়ে আছে। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নাট্যকারের পরিচয়, পঞ্চাশের মন্বন্তর ও গণনাট্য সংঘের পটভূমি, প্রধান চরিত্র, নামকরণের সার্থকতা এবং বাংলা থিয়েটারে এর অবদান, এই পাঁচটি দিক গুছিয়ে পড়ে নিন। তারিখ ও চরিত্রের খুঁটিনাটি লেখার সময় আপনার নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের তথ্য অনুসরণ করুন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
নবান্ন নাটকের রচয়িতা কে?
নবান্ন নাটকের রচয়িতা বিজন ভট্টাচার্য। তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘের একজন অগ্রণী নাট্যকার ও নির্দেশক ছিলেন।
নবান্ন নাটক প্রথম কবে মঞ্চস্থ হয়?
নাটকটি ১৯৪৪ সালে কলকাতার শ্রীরঙ্গম মঞ্চে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় প্রথম মঞ্চস্থ হয়।
নবান্ন নাটকের পটভূমি কী?
নাটকটি ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর বা বাংলার দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা। এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সংকট ও গণনাট্য আন্দোলনের যোগ রয়েছে।
নবান্ন নামকরণ কতটা সার্থক?
নবান্ন মানে নতুন ধানের অন্নে উৎসব। নাটকে ক্ষুধার ভয়াবহতার বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ চাষ ও নতুন ফসলের আশা ফুটে ওঠায় নামটি প্রতীকী ও সার্থক বলে ধরা হয়।
নবান্ন নাটকের মূল বিষয়বস্তু কী?
মূল বিষয় মন্বন্তরে চাষিজীবনের বিপর্যয়, মহাজনের শোষণ ও শহরের নির্লিপ্ততা। পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়ানোর আশাও এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।