বাক্য কাকে বলে? গুণ, অংশ ও প্রকারভেদ উদাহরণসহ
ব্যাকরণের প্রথম দিকের পাঠেই প্রশ্ন আসে, বাক্য কাকে বলে। উত্তরটা সংক্ষিপ্ত হলেও এর পেছনের ধারণাগুলো জানা থাকলে পরে বাক্যের শ্রেণিবিভাগ, বাক্য রূপান্তর ও শুদ্ধ রচনা অনেক সহজ লাগে। এই লেখায় আপনি বাক্যের সংজ্ঞা, অর্থপূর্ণ বাক্যের গুণ, বাক্যের দুই অংশ, অর্থ ও গঠন অনুযায়ী প্রকারভেদ, সাধারণ ভুল এবং একটি ছোট অনুশীলনী পাবেন।
বাক্য কাকে বলে
মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে এমন পদসমষ্টিকে বাক্য বলে। বেশির ভাগ বইয়ে বলা হয়, বাক্যে একাধিক পদ থাকবে এবং সেগুলো মিলে একটি পূর্ণ অর্থ দেবে। যেমন ‘শিউলি ফুল ঝরছে’ একটি বাক্য, কিন্তু শুধু ‘শিউলি ফুল’ বাক্য নয়, কারণ কী ঘটছে তা বলা হয়নি।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কথা আছে। ‘এসো’, ‘থামো’ বা ‘যাচ্ছি’ কথাগুলো একটি পদেই শেষ, তবু আমরা এগুলোকে পূর্ণ বাক্য হিসেবে ব্যবহার করি, কারণ ক্রিয়ার ভেতরেই কর্তা বোঝা যায়। তাই ‘একাধিক পদ’ শর্তটিকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে নিন, আর অন্তর্নিহিত কর্তাওয়ালা ছোট বাক্যগুলোকে ব্যতিক্রম হিসেবে মনে রাখুন। পরীক্ষায় আপনার পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞাই লিখবেন।
অর্থপূর্ণ বাক্যের তিন গুণ
কয়েকটি পদ পাশাপাশি বসালেই বাক্য হয় না। প্রচলিত ব্যাকরণে একটি আদর্শ বাক্যের তিনটি গুণের কথা বলা হয়: আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা। কোনো কোনো বই এর সঙ্গে আরও কিছু শর্ত, যেমন পদক্রম বা পদবিন্যাসের কথা আলাদা করে বলে, আবার কোনোটি আসত্তির মধ্যেই তা ধরে নেয়। তাই গুণের সংখ্যা ও ব্যাখ্যায় বইভেদে সামান্য তফাত দেখা যেতে পারে।
আকাঙ্ক্ষা
বক্তা যা বলতে চান, তা শুনে শ্রোতার আর কিছু জানার ইচ্ছা যদি না থাকে, তবে বাক্যে আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। ‘বাবা বাজার থেকে’ শুনলে মনে হয় কথা অসমাপ্ত; ‘বাবা বাজার থেকে ইলিশ এনেছেন’ বললে সম্পূর্ণ হয়। ‘যদি রোদ ওঠে’ বললেও পরের অংশটুকু জানতে ইচ্ছা করে, অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ।
আসত্তি
আসত্তি মানে নৈকট্য বা সংগত বিন্যাস। যে পদগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো একসঙ্গে ও স্বাভাবিক ক্রমে বসবে, যাতে অর্থ বুঝতে অসুবিধা না হয়। ‘আমি ভাত খাই’ স্বাভাবিক। ‘খাই ভাত আমি’ বুঝতে অসুবিধা না হলেও গদ্যে অস্বাভাবিক শোনায়। আবার বাক্যের মাঝখানে অনেক অবান্তর কথা ঢুকিয়ে কর্তা ও ক্রিয়াকে বহু দূরে সরিয়ে দিলেও অর্থ ঝাপসা হয়। কবিতায় অবশ্য ছন্দের কারণে পদক্রম বদলানো চলে।
যোগ্যতা
পদগুলোর অর্থগত সংগতি থাকলে বাক্যে যোগ্যতা আছে বলা হয়। ‘আমি কান দিয়ে ছবি দেখলাম’ বাক্যে ব্যাকরণের গঠন ঠিক থাকলেও অর্থ মেলে না, কারণ কান দিয়ে দেখা যায় না। আবার একই বাক্যে সাধু ও চলিত রীতি মিশিয়ে ফেললেও দোষ হয়, যেমন ‘তিনি বাজারে গেলেন এবং বলিলেন, আজ ফিরব না’। এ ধরনের মিশ্রণকে অনেক বইয়ে গুরুচণ্ডালী দোষ বলা হয়। কোন দোষ যোগ্যতার মধ্যে পড়বে, তা নিয়ে বইভেদে কিছুটা মতভেদ আছে।
বাক্যের দুই অংশ: উদ্দেশ্য ও বিধেয়
প্রতিটি বাক্যকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাঙা যায়।
- উদ্দেশ্য: যার সম্পর্কে কিছু বলা হচ্ছে। সাধারণত এখানে কর্তা থাকে।
- বিধেয়: উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে। এখানে ক্রিয়া থাকে এবং কর্ম, পূরক বা অন্য পদও থাকতে পারে।
উদাহরণ: ‘আমাদের পাড়ার বুড়ো মাঝি | রোজ ভোরে নৌকা নামায়।’ দাঁড়ির আগের অংশ উদ্দেশ্য। এর মূল কর্তা ‘মাঝি’, আর ‘আমাদের পাড়ার’ ও ‘বুড়ো’ তাকে বিশদ করছে। পরের অংশ বিধেয়, যার মূল ক্রিয়া ‘নামায়’ এবং কর্ম ‘নৌকা’।
কখনো উদ্দেশ্য উহ্য থাকে। ‘দরজাটা খোলো’ বাক্যে ‘তুমি’ শব্দটি না থাকলেও বোঝা যায়। উদ্দেশ্য ও বিধেয় চিনতে পারলে পরের অংশে খণ্ডবাক্য ভাগ করাও সহজ হবে।
অর্থ অনুযায়ী বাক্যের প্রকারভেদ
বক্তা কী উদ্দেশ্যে বলছেন, তার ওপর ভিত্তি করে বাক্যকে কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। বেশির ভাগ বইয়ে এই ভাগগুলো পাওয়া যায়।
| প্রকার | কাজ | উদাহরণ |
|---|---|---|
| বিবৃতিমূলক | কিছু জানানো বা বর্ণনা করা; হ্যাঁ-সূচক ও না-সূচক দুই রকমই হয় | আমরা আজ নদীর ধারে গিয়েছিলাম। / আজ স্কুল খোলেনি। |
| প্রশ্নবোধক | প্রশ্ন করা | আপনার বাড়ি কোথায়? |
| অনুজ্ঞাসূচক | আদেশ, নিষেধ, অনুরোধ বা উপদেশ | দরজাটা বন্ধ করো। / এখানে ময়লা ফেলো না। / দয়া করে একটু সরে বসুন। |
| ইচ্ছা বা প্রার্থনাসূচক | ইচ্ছা, শুভকামনা বা আশীর্বাদ প্রকাশ | তুমি সুখে থাকো। / ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। |
| বিস্ময়সূচক | বিস্ময়, আনন্দ, দুঃখ বা আবেগ প্রকাশ | কী সুন্দর ফুল! / বাহ, দারুণ খেলেছ! |
সব বইয়ে এই পাঁচটি আলাদা করে দেখানো হয় না। কোথাও ইচ্ছাসূচক ও প্রার্থনাসূচক বাক্য অনুজ্ঞার মধ্যেই ধরা হয়, আবার কোথাও শর্তবাচক (যদি-তবে), সন্দেহবাচক (হয়তো সে আসবে) বা কার্যকারণাত্মক বাক্যের মতো বাড়তি ভাগ যোগ করা হয়। তাই পরীক্ষার আগে নিজের বইয়ের তালিকা মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
একটি বিষয়ে সতর্ক থাকুন। শেষে প্রশ্নচিহ্ন থাকলেই বাক্য প্রশ্নবোধক হয় না, আবার প্রশ্ন করার ভঙ্গি ছাড়া কিছু বাক্যও প্রশ্নের কাজ করে। ‘সে জানতে চাইল তুমি কোথায় থাকো’ বাক্যে প্রশ্নের কথা আছে, কিন্তু বাক্যটি আসলে একটি বিবরণ, তাই সেটি বিবৃতিমূলক।
গঠন অনুযায়ী বাক্যের প্রকারভেদ
এবার দেখা যাক বাক্যটি কীভাবে গড়া। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, বাক্যে কয়টি সমাপিকা ক্রিয়া আছে এবং খণ্ডবাক্যগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কেমন।
- সরল বাক্য: একটি উদ্দেশ্য ও একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে। অসমাপিকা ক্রিয়া একাধিক থাকলেও বাক্য সরলই থাকে।
- জটিল বাক্য: একটি প্রধান খণ্ডবাক্যের সঙ্গে এক বা একাধিক আশ্রিত খণ্ডবাক্য যুক্ত থাকে। আশ্রিত অংশ আলাদা করলে অর্থ অসম্পূর্ণ থাকে। কিছু বইয়ে একে মিশ্র বাক্যও বলা হয়।
- যৌগিক বাক্য: দুই বা তার বেশি স্বাধীন বাক্য সংযোজক বা বিয়োজক অব্যয়ে যুক্ত হয়। প্রতিটি অংশ আলাদা করেও পূর্ণ অর্থ দেয়।
| প্রকার | চেনার উপায় | উদাহরণ |
|---|---|---|
| সরল | একটি সমাপিকা ক্রিয়া | ছেলেটি মাঠে ফুটবল খেলছে। / সে হাত ধুয়ে খেতে বসল। |
| জটিল | একটি প্রধান ও একটি আশ্রিত খণ্ড; প্রায়ই যে-সে, যদি-তবে, যখন-তখন জাতীয় জোড় | যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয়। / যদি বৃষ্টি হয়, তবে খেলা হবে না। |
| যৌগিক | স্বাধীন খণ্ডগুলো এবং, ও, কিন্তু, অথবা, তবু ইত্যাদি দিয়ে যুক্ত | রহিম গান গায় এবং করিম ছবি আঁকে। / আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বৃষ্টি থামল না। |
‘সে হাত ধুয়ে খেতে বসল’ বাক্যে ‘ধুয়ে’ ও ‘খেতে’ দুটোই অসমাপিকা, সমাপিকা ক্রিয়া শুধু ‘বসল’। তাই এটি সরল। এখানেই অনেকে ভুল করে একে জটিল বা যৌগিক বলে ফেলেন।
জটিল ও যৌগিকের পার্থক্য মনে রাখার একটি সহজ পথ আছে। জটিল বাক্যে একটি অংশ অন্যটির ওপর নির্ভরশীল, আর যৌগিক বাক্যে অংশগুলো সমান মর্যাদার, প্রত্যেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আরও মনে রাখবেন, কমা বা সেমিকোলনও দুটি স্বাধীন বাক্যকে যুক্ত করতে পারে, শুধু ‘এবং’ থাকতেই হবে এমন নয়।
সাধারণ ভুল ও তা এড়ানোর উপায়
- ক্রিয়া বাদ দেওয়া। ‘আমি কাল ঢাকায়’ লিখলে বাক্য অসমাপ্ত থাকে। লেখা শেষে দেখে নিন সমাপিকা ক্রিয়া আছে কি না।
- অসমাপিকাকে সমাপিকা ভাবা। ‘করে’, ‘গিয়ে’, ‘খেতে’ ক্রিয়া বাক্য শেষ করে না। এগুলো গুনে খণ্ডবাক্য ঠিক করবেন না।
- বিরামচিহ্ন দেখে প্রকার ঠিক করা। প্রশ্নচিহ্ন বা বিস্ময়চিহ্ন বাক্যের প্রকার নির্ধারণ করে না, বাক্যের ভাবই নির্ধারণ করে।
- সাধু ও চলিত মিশিয়ে ফেলা। পুরো রচনায় একই রীতি ধরে রাখুন।
- অর্থহীন সংযোজন। ‘এবং’ বা ‘কিন্তু’ দিয়ে এমন দুটি কথা জোড়া, যাদের মধ্যে কোনো যুক্তি নেই।
- অতি দীর্ঘ বাক্য। একটি বাক্যে অনেক খণ্ড ঢোকালে আসত্তি নষ্ট হয়। বড় ভাবকে দুই-তিনটি বাক্যে ভাগ করুন।
নিজে চেষ্টা করুন
উত্তর না দেখে প্রতিটি বাক্যের অর্থ অনুযায়ী ও গঠন অনুযায়ী প্রকার বলুন।
- আপনি কি চা খাবেন?
- তোমার জীবন আনন্দে ভরে উঠুক।
- বৃষ্টি পড়ছিল, তবু আমরা বেরোলাম।
- যে বই পড়ে, সে অনেক কিছু জানে।
- মা রান্নাঘরে রান্না করছেন।
- সে বই নিয়ে ঘরে গিয়ে বসল।
উত্তর:
- অর্থে প্রশ্নবোধক; গঠনে সরল (একটি সমাপিকা ক্রিয়া ‘খাবেন’)।
- অর্থে ইচ্ছা বা প্রার্থনাসূচক (শুভকামনা); গঠনে সরল।
- অর্থে বিবৃতিমূলক; গঠনে যৌগিক, কারণ দুটি স্বাধীন খণ্ড ‘তবু’ দিয়ে যুক্ত।
- অর্থে বিবৃতিমূলক; গঠনে জটিল, কারণ ‘যে’ দিয়ে শুরু অংশটি আশ্রিত খণ্ড।
- অর্থে বিবৃতিমূলক; গঠনে সরল।
- অর্থে বিবৃতিমূলক; গঠনে সরল, কারণ ‘নিয়ে’ ও ‘গিয়ে’ অসমাপিকা, সমাপিকা শুধু ‘বসল’।
শেষ কথা
বাক্য চেনার জন্য আগে দেখুন অর্থ পূর্ণ হয়েছে কি না, তারপর উদ্দেশ্য ও বিধেয় আলাদা করুন। অর্থের দিক থেকে বাক্য বিবৃতি, প্রশ্ন, অনুজ্ঞা, ইচ্ছা-প্রার্থনা ও বিস্ময়ের মতো ভাগে পড়ে, আর গঠনের দিক থেকে সরল, জটিল ও যৌগিক। প্রতিদিন পত্রিকা বা পাঠ্যবই থেকে দু-তিনটি বাক্য তুলে নিয়ে দুই দিক থেকেই প্রকার নির্ণয়ের চর্চা করলে বিষয়টি দ্রুত আয়ত্তে আসবে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
বাক্য কাকে বলে?
মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে এমন পদসমষ্টিকে বাক্য বলে। সাধারণত একাধিক পদ থাকে, তবে ‘এসো’-র মতো ছোট বাক্যে কর্তা উহ্য থাকে।
বাক্যের তিনটি গুণ কী কী?
আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা। অর্থাৎ অর্থ সম্পূর্ণ হওয়া, পদ যথাস্থানে থাকা এবং পদগুলোর অর্থে সংগতি থাকা। কিছু বইয়ে ব্যাখ্যায় সামান্য তফাত আছে।
উদ্দেশ্য ও বিধেয় কী?
বাক্যে যার সম্পর্কে বলা হয় তা উদ্দেশ্য, আর উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা বলা হয় তা বিধেয়। বিধেয়ে সাধারণত ক্রিয়া থাকে।
সরল, জটিল ও যৌগিক বাক্যের পার্থক্য কী?
সরল বাক্যে একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে। জটিল বাক্যে একটি প্রধান ও আশ্রিত খণ্ড থাকে, আর যৌগিক বাক্যে স্বাধীন খণ্ডগুলো অব্যয় দিয়ে যুক্ত হয়।
অর্থ অনুযায়ী বাক্য কত প্রকার?
প্রচলিত তালিকায় বিবৃতিমূলক, প্রশ্নবোধক, অনুজ্ঞাসূচক, ইচ্ছা বা প্রার্থনাসূচক এবং বিস্ময়সূচক বাক্য পাওয়া যায়। কোনো বইয়ে এর সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে।