উপসর্গ কাকে বলে: প্রকারভেদ, তালিকা ও উদাহরণ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ · বাংলা ব্যাকরণ

সংক্ষেপেউপসর্গের সংজ্ঞা, অনুসর্গ ও প্রত্যয়ের সঙ্গে পার্থক্য, তিন ধরনের উপসর্গের তালিকা, অর্থ বদলের নিয়ম, সাধারণ ভুল আর অনুশীলনী এখানে সহজ ভাষায় দেওয়া হলো।

‘সুনাম’ আর ‘দুর্নাম’ শব্দ দুটির মাঝের অংশ ‘নাম’ একই, অথচ অর্থ একেবারে উল্টো। এই উল্টে যাওয়ার কারণ শব্দের শুরুতে বসা ছোট একটি অংশ। বাংলা ব্যাকরণে এমন অংশকে বলা হয় উপসর্গ। এই লেখায় আপনি উপসর্গ কাকে বলে, তার প্রকারভেদ, অনুসর্গ ও প্রত্যয়ের সঙ্গে পার্থক্য, চেনার কৌশল আর কিছু অনুশীলনী পাবেন।

উপসর্গ বলতে কী বোঝায়

যেসব শব্দাংশ নিজে স্বাধীন শব্দ হিসেবে বসে না, কিন্তু অন্য শব্দ বা ধাতুর আগে বসে সেই শব্দের অর্থ বদলে দেয়, নতুন অর্থ যোগ করে কিংবা সম্পূর্ণ নতুন শব্দ তৈরি করে, তাদের উপসর্গ বলে। ‘উপসর্গ’ কথাটির আক্ষরিক ভাব হলো ‘কাছে এসে যুক্ত হওয়া’।

একটি উদাহরণ দেখুন। ‘হার’ অংশটির (মূলত ধাতু থেকে আসা) আগে ‘আ’ বসালে হয় আহার, ‘বি’ বসালে বিহার, ‘প্র’ বসালে প্রহার, ‘উপ’ বসালে উপহার। একই মূল অংশ থেকে চারটি আলাদা অর্থের শব্দ তৈরি হলো। এই কাজটিই উপসর্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

নিচের তিনটি বিষয় মনে রাখলে পরে বিভ্রান্তি কমবে।

উপসর্গ, অনুসর্গ ও প্রত্যয়ের পার্থক্য

তিনটি বিষয়ই শব্দের সঙ্গে জড়িত, তাই নবীনদের গুলিয়ে যায়। আসলে এদের অবস্থান ও কাজ আলাদা।

বিষয়কোথায় বসেস্বাধীন শব্দ কি নাউদাহরণ
উপসর্গশব্দ বা ধাতুর আগেনাবি + জয় = বিজয়
অনুসর্গশব্দের পরে আলাদা পদ হিসেবেহ্যাঁ, আলাদা শব্দ হিসেবেই লেখা হয়কলম দিয়ে, গ্রাম থেকে, তোমার জন্য
প্রত্যয়ধাতু বা নামশব্দের পরে, শব্দের সঙ্গে জুড়েনামানব + তা = মানবতা

অর্থাৎ ‘দিয়ে’, ‘থেকে’, ‘জন্য’ জাতীয় শব্দ অনুসর্গ, কারণ এরা আলাদা শব্দ হয়ে কারকের সম্পর্ক বোঝায়। আর ‘তা’, ‘ত্ব’, ‘আমি’ প্রত্যয়, কারণ এরা শব্দের পরে জুড়ে গিয়ে একটি নতুন শব্দ গঠন করে। উপসর্গকে এ দুইয়ের থেকে আলাদা করে চেনার সহজ চাবি হলো অবস্থান: আগে বসলে উপসর্গ।

উপসর্গের প্রকারভেদ

উৎস অনুযায়ী উপসর্গকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়: খাঁটি বাংলা, সংস্কৃত (তৎসম) ও বিদেশি। তবে তালিকা ও সংখ্যা সব বইয়ে এক নয়। কোনো বই বাংলা উপসর্গের একটি ধরন বেশি ধরে, কোনো বই কম। তাই নিচের তালিকাকে বহুল ব্যবহৃত অংশ হিসেবে দেখুন, আর পরীক্ষার জন্য আপনার পাঠ্যবইয়ের তালিকা মিলিয়ে নিন।

১. খাঁটি বাংলা উপসর্গ

এগুলো বাংলা ভাষার নিজস্ব। অনেক সময় সংস্কৃত উপসর্গের সঙ্গে এদের চেহারা মিলে যায়, কিন্তু ব্যবহার বাংলা শব্দের সঙ্গে।

২. সংস্কৃত বা তৎসম উপসর্গ

সংস্কৃত থেকে আসা উপসর্গের সংখ্যা সাধারণত ২০টি ধরা হয়। নিচে সবগুলোর মূল ভাব ও একটি-দুটি উদাহরণ দেওয়া হলো।

লক্ষ করুন, নি, বি, সু আর আ বাংলা ও সংস্কৃত দুই তালিকাতেই আসতে পারে। বাংলা শব্দের সঙ্গে বসলে এদের বাংলা উপসর্গ, আর সংস্কৃত শব্দের সঙ্গে বসলে সংস্কৃত উপসর্গ ধরার চল আছে। যেমন ‘নিখুঁত’-এ ‘নি’ বাংলা, ‘নিবাস’-এ ‘নি’ সংস্কৃত।

৩. বিদেশি উপসর্গ

আরবি, ফারসি ও ইংরেজি থেকে আসা কিছু অংশ বাংলায় উপসর্গের মতো ব্যবহার হয়। কোন কোন অংশকে উপসর্গ বলা হবে, এ নিয়েও বইয়ে কিছু মতভেদ আছে।

উদাহরণের ছক

নিচের ছকে উপসর্গ ও মূল অংশ আলাদা করে দেখানো হলো। কোথাও কোথাও সন্ধির কারণে বর্ণ বদলে গেছে, সেটিও খেয়াল করুন।

শব্দবিশ্লেষণউৎসউপসর্গের ভাব
অনুসরণঅনু + সরণসংস্কৃতপিছনে
নির্ভয়নির্ + ভয়সংস্কৃতঅভাব
সংগীতসম্ + গীতসংস্কৃতভালোভাবে, একত্র
উদ্ভবউৎ + ভবসংস্কৃতঊর্ধ্ব দিকে
পরিভ্রমণপরি + ভ্রমণসংস্কৃতচারদিকে
অকাজঅ + কাজবাংলানা
ভরদুপুরভর + দুপুরবাংলাপুরোপুরি
আনমনাআন + মনাবাংলাঅন্য
বেহিসাববে + হিসাবফারসিছাড়া
হেডমাস্টারহেড + মাস্টারইংরেজিপ্রধান

উপসর্গ কীভাবে অর্থ বদলায়

উপসর্গ শব্দের অর্থ বদলায় প্রধানত তিনভাবে।

  1. অর্থ উল্টে দেয়। সুনাম থেকে দুর্নাম, বিজয় থেকে পরাজয়, গমন থেকে নির্গমন।
  2. অর্থের জোর বাড়ায় বা পরিধি বদলায়। ‘বল’ থেকে ‘প্রবল’ অর্থে শক্তির আধিক্য বোঝায়। আবার নদীর আগে ‘উপ’ বসালে উপনদী হয়, যা ছোট ও অধীন নদী।
  3. সম্পূর্ণ নতুন অর্থ তৈরি করে। আগে দেখা ‘হার’ থেকে আহার, বিহার, প্রহার, উপহার তার প্রমাণ। আরও কয়েকটি: সংহার, পরিহার।

একটি বিষয় খেয়াল রাখা ভালো। উপসর্গ অনেক সময় শুধু শব্দের নয়, ধাতুর আগেও বসে। প্রহার বা আগমনের মতো শব্দে মূল অংশ ধাতু থেকে এসেছে। ছাত্রজীবনে আপনাকে ধাতুর দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করতে না হলেও এই ধারণাটি থাকলে উপসর্গের কাজ ভালো বোঝা যায়।

উপসর্গ চেনার উপায় ও সাধারণ ভুল

চেনার কয়েকটি ধাপ

  1. শব্দের শুরুর অংশটি আলাদা করে দেখুন।
  2. বাকি অংশ কি অর্থপূর্ণ কোনো শব্দ বা ধাতু? না হলে শুরুর অংশটি উপসর্গ না-ও হতে পারে।
  3. শুরুর অংশটি জুড়ে দেওয়ায় অর্থ বদলাচ্ছে কি না ভাবুন।
  4. সন্ধির পরিবর্তন মাথায় রাখুন, যেমন সম্ + গীত = সংগীত।

সাধারণ ভুল

বাংলা উপসর্গ কতগুলো, এ নিয়ে একমত তালিকা নেই। কেউ ২১টি ধরেন, কেউ আরও বেশি বা কম। কোনো পরীক্ষায় সংখ্যা জানতে চাইলে আপনার নির্ধারিত বইয়ের সংখ্যাই লিখুন।

নিজে চেষ্টা করুন

উত্তর না দেখে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।

  1. ‘প্রতিদিন’ শব্দে উপসর্গ কোনটি?
  2. ‘বেআইনি’ শব্দের উপসর্গ কোন ভাষার?
  3. ‘সুনাম’-এর বিপরীত শব্দে কোন উপসর্গ আছে?
  4. ‘উপকূল’ শব্দের উপসর্গ কী অর্থ প্রকাশ করছে?
  5. ‘নির্জন’ শব্দটি ভেঙে লিখুন।
  6. ‘বিদ্যা’ শব্দে কি উপসর্গ আছে?

উত্তর:

  1. প্রতি (সংস্কৃত উপসর্গ)।
  2. ফারসি।
  3. দুর্ (দুর্নাম)।
  4. ‘কাছে’ বা ‘নিকটবর্তী’। উপকূল মানে কূলের কাছের অঞ্চল।
  5. নির্ + জন।
  6. না, ‘বিদ্যা’ একটি অখণ্ড শব্দ, এতে উপসর্গ নেই।

শেষ কথা

উপসর্গের মূল কথা খুব সরল: স্বাধীন ব্যবহার নেই, শব্দের আগে বসে, আর অর্থ বদলে দেয়। অনুসর্গ আলাদা শব্দ হয়ে পরে বসে, আর প্রত্যয় জুড়ে যায় শব্দের পরে। উৎস অনুযায়ী খাঁটি বাংলা, সংস্কৃত ও বিদেশি এই তিন ভাগ মনে রাখুন, আর বিশ্লেষণের সময় সন্ধির পরিবর্তনের দিকে নজর দিন। প্রতিদিন কয়েকটি শব্দ ভেঙে নিজে চর্চা করলে উপসর্গ চেনা আপনার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

উপসর্গ কাকে বলে?

যে শব্দাংশ স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হয় না, কিন্তু অন্য শব্দ বা ধাতুর আগে বসে তার অর্থ বদলে দেয় বা নতুন শব্দ গড়ে, তাকে উপসর্গ বলে। যেমন সু + নাম = সুনাম।

উপসর্গ ও অনুসর্গের পার্থক্য কী?

উপসর্গ শব্দের আগে জুড়ে বসে এবং স্বাধীন শব্দ নয়। অনুসর্গ শব্দের পরে আলাদা পদ হিসেবে বসে, যেমন ‘কলম দিয়ে’-র ‘দিয়ে’।

উপসর্গ ও প্রত্যয়ের পার্থক্য কী?

উপসর্গ শব্দ বা ধাতুর আগে বসে, আর প্রত্যয় ধাতু বা নামশব্দের পরে বসে। যেমন ‘বিজয়’-এ ‘বি’ উপসর্গ এবং ‘মানবতা’-য় ‘তা’ প্রত্যয়।

উপসর্গ কত প্রকার?

উৎস অনুযায়ী সাধারণত তিন প্রকার: খাঁটি বাংলা, সংস্কৃত বা তৎসম এবং বিদেশি। সংস্কৃত উপসর্গ সাধারণত ২০টি ধরা হয়, তবে বাংলা ও বিদেশি উপসর্গের তালিকা বইভেদে আলাদা।

উপসর্গ কীভাবে অর্থ বদলায়?

উপসর্গ কখনো অর্থ উল্টে দেয়, যেমন সুনাম থেকে দুর্নাম। কখনো অর্থের জোর বা পরিধি বদলায়, কখনো একেবারে নতুন অর্থ তৈরি করে, যেমন হার থেকে আহার ও প্রহার।