প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়: সহজ নিয়ম ও উদাহরণ

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · বাংলা ব্যাকরণ

সংক্ষেপেএকটি শব্দ ভেঙে প্রকৃতি ও প্রত্যয় আলাদা করার সহজ পদ্ধতি, কৃৎ ও তদ্ধিতের পার্থক্য, উদাহরণ, সাধারণ ভুল আর অনুশীলনী এখানে গুছিয়ে দেওয়া হলো।

বাংলা ব্যাকরণের পরীক্ষায় প্রায়ই একটি শব্দ দিয়ে বলা হয়, ‘প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় করো’। প্রশ্নটি ছোট, কিন্তু উত্তরে ভুল হলে নম্বর কাটা যায়। বিসিএস, ভর্তি পরীক্ষা বা এইচএসসি, সব জায়গাতেই এই অধ্যায় থেকে প্রশ্ন আসে। এই লেখায় আপনি প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়ের মূল ধারণা, একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, কিছু মনে রাখার কৌশল এবং নিজে চর্চা করার মতো প্রশ্ন পাবেন।

প্রকৃতি ও প্রত্যয় বলতে কী বোঝায়

কিছু শব্দকে ভাঙলে ছোট অর্থবহ অংশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে যে অংশটি শব্দের মূল ভিত্তি, যাকে আর ভাঙা যায় না, তাকেই বলে প্রকৃতি। আর প্রকৃতির পরে বসে যে অংশ নতুন শব্দ বা নতুন অর্থ তৈরি করে, তার নাম প্রত্যয়। যেমন ‘চলন্ত’ শব্দের মূল অংশ ‘চল্’, আর শেষে বসা ‘অন্ত’ হলো প্রত্যয়।

একটা কথা খেয়াল রাখুন। প্রত্যয় সবসময় প্রকৃতির পরে বসে, আর উপসর্গ বসে শব্দের আগে। এই পার্থক্য পরে আপনার অনেক ভুল বাঁচাবে।

প্রকৃতির প্রকারভেদ

প্রকৃতি প্রধানত দুই রকম।

ধাতুরও আবার দুটি ভাগ আছে। যে ধাতু আর ভাঙা যায় না, তা মৌলিক ধাতু, যেমন √পড়্। আর অন্য শব্দ বা প্রত্যয় যোগে তৈরি ধাতুকে বলে সাধিত ধাতু। যেমন √কর্ থেকে ‘করানো’র ধাতু (ণিজন্ত বা প্রযোজক ধাতু) এবং ‘ঘুম’ নামশব্দ থেকে ‘ঘুমানো’র ধাতু (নামধাতু)। পরীক্ষায় সাধারণত মৌলিক ধাতু ধরেই বিশ্লেষণ চাওয়া হয়।

প্রত্যয়ের শ্রেণিবিভাগ

প্রত্যয় কোন প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে প্রত্যয়কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

কৃৎ প্রত্যয়

ধাতুর সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়, সেটি কৃৎ প্রত্যয়। কৃৎ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে শব্দ তৈরি হয়, তাকে কৃদন্ত শব্দ বলে। উৎস অনুযায়ী কৃৎ প্রত্যয় সাধারণত দুই ধরনের পড়ানো হয়।

তদ্ধিত প্রত্যয়

নামশব্দের সঙ্গে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়, তা তদ্ধিত প্রত্যয়। এভাবে তৈরি শব্দকে তদ্ধিতান্ত শব্দ বলা হয়। এখানে সাধারণত তিন ধরনের ভাগ দেখা যায়।

অর্থের দিক থেকেও সংস্কৃত তদ্ধিতের নানা ভাগ আছে। যেমন অপত্য (সন্তান) অর্থে দশরথ থেকে ‘দাশরথি’, ভাব অর্থে শিশু থেকে ‘শিশুত্ব’। এই সূক্ষ্ম শ্রেণিবিভাগ সাধারণত উচ্চস্তরের পাঠে দরকার হয়।

কৃৎ আর তদ্ধিতের সবচেয়ে সোজা পার্থক্য হলো প্রকৃতিতে। প্রকৃতি ধাতু হলে প্রত্যয় কৃৎ, আর প্রকৃতি নামশব্দ হলে প্রত্যয় তদ্ধিত।

প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়ের ধাপ

অচেনা শব্দ পেলেও নিচের ধাপগুলো ধরে এগোলে বিভ্রান্তি কমে।

  1. উপসর্গ আছে কি না দেখুন। শব্দের শুরুতে উপসর্গ থাকলে সেটি আলাদা করে ভাবুন, কারণ সেটি প্রত্যয় নয়।
  2. শেষের অংশে চোখ রাখুন। চেনা কোনো প্রত্যয় (অন্ত, আমি, তা, ত্ব, দার ইত্যাদি) শব্দের শেষে আছে কি না খুঁজুন।
  3. বাকি অংশটি যাচাই করুন। সেটি কি ক্রিয়ার মূল? পরীক্ষা করার একটি উপায় হলো তার সঙ্গে ‘ছি’ বা ‘তে’ জুড়ে দেখা। ‘চল্’ থেকে ‘চলছি’, ‘চলতে’ হয়, তাই ‘চল্’ ধাতু। কিন্তু ‘গুণছি’ বা ‘ধনতে’ অর্থবহ ক্রিয়া হয় না, বরং গুণ আর ধন নামশব্দ।
  4. প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের ধরন ঠিক করুন। ধাতু হলে কৃৎ, নামশব্দ হলে তদ্ধিত। এরপর প্রত্যয়টি বাংলা, বিদেশি না সংস্কৃত, তা বিবেচনা করুন।
  5. লেখার সময় চিহ্ন ব্যবহার করুন। ধাতুর আগে √ বসান। যেমন: ঘুমন্ত = √ঘুম্ + অন্ত।
  6. রূপ বদলের দিকে খেয়াল রাখুন। সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হলে ধাতু বা শব্দের স্বরে পরিবর্তন হতে পারে। √কৃ + তব্য যুক্ত হয়ে ‘কর্তব্য’ হয়, √পঠ্ + ণক্ যুক্ত হয়ে ‘পাঠক’ হয়। সংস্কৃত প্রত্যয়ে ণ্ বা ক্ জাতীয় কিছু বর্ণ ‘ইৎ’ হয়ে লোপ পায়, তাই ‘ণক্’ শেষ পর্যন্ত ‘অক’ রূপে থাকে।

একটি পূর্ণ উদাহরণ ধরা যাক ‘দোকানদার’। শুরুতে কোনো উপসর্গ নেই। শেষে ‘দার’ আছে, যা চেনা প্রত্যয়। বাকি অংশ ‘দোকান’ একটি নামশব্দ, কারণ ‘দোকানছি’ বলে কোনো ক্রিয়া হয় না। তাই এটি তদ্ধিত, আর ‘দার’ ফারসি উৎসের বলে বিদেশি তদ্ধিত। এভাবে প্রতিটি ধাপে নিজেকে প্রশ্ন করলে উত্তর নিজে থেকেই পরিষ্কার হয়ে আসে। পরীক্ষার খাতায় শুধু ‘দোকান + দার’ না লিখে প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের ধরনও লিখে দিলে উত্তর সম্পূর্ণ দেখায়।

কখনো এমন হয় যে শব্দের শেষে চেনা প্রত্যয়ের মতো অংশ আছে, কিন্তু আসলে সেটি প্রত্যয় নয়। তাই শুধু শেষ অক্ষর দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাকি অংশটি আলাদা করে অর্থসহ পড়ুন। বাকি অংশ থেকে যদি কোনো অর্থপূর্ণ ধাতু বা নামশব্দ পাওয়া যায়, তবেই বিশ্লেষণটি নির্ভরযোগ্য।

উদাহরণের তালিকা

নিচের ছকে শব্দ, তার বিশ্লেষণ এবং প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের ধরন দেওয়া হলো।

শব্দবিশ্লেষণপ্রকৃতিপ্রত্যয়
চলন্ত√চল্ + অন্তধাতুবাংলা কৃৎ
হাসি√হাস্ + ইধাতুবাংলা কৃৎ
রাঁধুনি√রাঁধ্ + উনিধাতুবাংলা কৃৎ
কর্তব্য√কৃ + তব্যধাতুসংস্কৃত কৃৎ
পাঠক√পঠ্ + ণক্ধাতুসংস্কৃত কৃৎ
পাগলামিপাগল + আমিনামশব্দবাংলা তদ্ধিত
ঢাকাইঢাকা + ইনামশব্দবাংলা তদ্ধিত
দোকানদারদোকান + দারনামশব্দবিদেশি তদ্ধিত
বাবুগিরিবাবু + গিরিনামশব্দবিদেশি তদ্ধিত
মানবতামানব + তানামশব্দসংস্কৃত তদ্ধিত
ধনীধন + ইন্নামশব্দসংস্কৃত তদ্ধিত

লক্ষ করুন, ‘ই’ প্রত্যয়টি ‘হাসি’তেও আছে, ‘ঢাকাই’তেও আছে। প্রথমটি ধাতুর সঙ্গে, তাই কৃৎ; দ্বিতীয়টি নামশব্দের সঙ্গে, তাই তদ্ধিত। প্রত্যয়ের চেহারা দেখে নয়, প্রকৃতি দেখে সিদ্ধান্ত নিন।

মনে রাখার কৌশল ও সাধারণ ভুল

কয়েকটি কৌশল

এসব কৌশল কাজে লাগাতে হলে নিয়মিত চর্চা দরকার। প্রতিদিন পত্রিকা বা পাঠ্যবই থেকে কয়েকটি শব্দ তুলে নিয়ে নিজে ভাঙার চেষ্টা করুন। পরে বই মিলিয়ে দেখুন। কোন ধরনের শব্দে বারবার ভুল হচ্ছে, তা এভাবে নিজেই ধরা পড়বে।

সাধারণ ভুল

কিছু বিষয়ে ব্যাকরণ বইয়ে মতভেদ আছে। প্রত্যয়ের নাম কোথাও ‘ণক্’, কোথাও ‘অক’ লেখা হয়। ‘গুলো’, ‘টা’ জাতীয় অংশকে কেউ প্রত্যয়, কেউ নির্দেশক বা বচনসূচক অংশ বলেন। তাই পরীক্ষার আগে আপনার পাঠ্যবইয়ের রীতিটি মিলিয়ে নিন।

নিজে চেষ্টা করুন

প্রথমে উত্তর না দেখে নিচের শব্দগুলো বিশ্লেষণ করুন।

  1. ঘুমন্ত
  2. শিশুত্ব
  3. নায়ক
  4. পড়া
  5. পাহাড়ি

উত্তর:

  1. ঘুমন্ত = √ঘুম্ + অন্ত (বাংলা কৃৎ)
  2. শিশুত্ব = শিশু + ত্ব (সংস্কৃত তদ্ধিত)
  3. নায়ক = √নী + ণক্ (সংস্কৃত কৃৎ; ধাতুর স্বর বদলে ‘নায়’ হয়েছে)
  4. পড়া = √পড়্ + আ (বাংলা কৃৎ)
  5. পাহাড়ি = পাহাড় + ই (বাংলা তদ্ধিত)

শেষ কথা

প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়ের মূল চাবি হলো আগে প্রকৃতিকে চেনা। ধাতু হলে কৃৎ, নামশব্দ হলে তদ্ধিত, আর তারপর উৎস অনুযায়ী বাংলা, বিদেশি বা সংস্কৃত ভাগ করা। উপসর্গ আলাদা রাখুন, √ চিহ্ন ব্যবহার করুন আর সংস্কৃত প্রত্যয়ে রূপ বদলের দিকে নজর দিন। রোজ পাঁচ-সাতটি শব্দ নিয়ে এই ধাপগুলো মেনে চর্চা করলে কয়েক দিনেই আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

প্রকৃতি কাকে বলে?

শব্দের যে মূল অংশকে আর ভাঙা যায় না, তাকে প্রকৃতি বলে। প্রকৃতি দুই রকম: ধাতু বা ক্রিয়াপ্রকৃতি এবং নামপ্রকৃতি।

প্রত্যয় কাকে বলে?

ধাতু বা নামশব্দের পরে বসে যে অংশ নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে প্রত্যয় বলে। যেমন ‘চলন্ত’ শব্দের ‘অন্ত’।

কৃৎ ও তদ্ধিত প্রত্যয়ের পার্থক্য কী?

ধাতুর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যয় কৃৎ, আর নামশব্দের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যয় তদ্ধিত। কৃৎ যোগে কৃদন্ত এবং তদ্ধিত যোগে তদ্ধিতান্ত শব্দ তৈরি হয়।

প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়ের সহজ উপায় কী?

প্রথমে উপসর্গ আলাদা করুন, তারপর শেষের প্রত্যয় চিনুন এবং বাকি অংশ ধাতু না নামশব্দ তা যাচাই করুন। ধাতু হলে কৃৎ, নামশব্দ হলে তদ্ধিত লিখুন।

ধাতু চেনার সহজ পরীক্ষা কী?

মূল অংশের সঙ্গে ‘ছি’ যোগ করে দেখুন অর্থবহ ক্রিয়া হয় কি না। যেমন চল্ থেকে চলছি হয়, তাই চল্ ধাতু।